এই পাতাটি প্রিন্ট করুন এই পাতাটি প্রিন্ট করুন

অপরিপক্ক আমে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক

Share

আমে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক

কৃষিবিদ জাহেদুল আলম রুবেল

আমে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক

সাতক্ষীরার হাট বাজারে প্রচুর আম। স্রোতের মতো বাজারে আসা এসব আমের প্রায় বেশীরভাগই অপরিপক্ক। আর এসব অপরিপক্ক আমের রং বাড়াতে ক্ষতিকর রাসায়নিক (ক্যামিকেল) মিশিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে পাঠাচ্ছে মুনাফালোভী আম চাষী ও ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন আম চাষী ও আড়তদারদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বাজার মনিটরিং কমিটিও নিয়মিত তদারকি করলেও আম বাগান বা গাছ তলায় কোন তদারকি না থাকায় আমে ক্যামিকেল মেশানো সহজ কাজ বলে মনে করেন আম চাষীরাও।

প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আমে দেদারছে ব্যবহার করা হচ্ছে এই ক্যামিকেল। আম চাষীরা গাছ থেকে আম পেড়ে গাছ তলায় বসেই ক্যামিকেল মিশিয়ে ট্রাক লোড করে তা নিয়ে যাচ্ছে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরে। তালা উপজেলার নগরঘাটা স্কুলের সামনে বসে কথা হয় একই গ্রামের আম চাষী কামরুল ইসলামের (৩০) সাথে। তিনি জানান, চলতি বছর ঝড়ে তার আমের অনেক ক্ষতি হয়েছে। যে কোন সময় আরও ঝড় বৃষ্টি হতে পারে। তাই আমে পাক ধরার আগেই সে অপরিপক্ক আম বিক্রি করা শুরু করেছে। রজমান মাসে আমের দামও বেশী যাচ্ছে। তিনি জানান, আমের রং বাড়ানোর জন্য (মেডিসিনে কাঁচা আম পাকা দেখা যাবে) এক ধরনের ভারতীয় মেডিসিন পাওয়া যায়। বাজারে আম নেয়ার এক দিন আগে মেডিসিন পানিতে গুলে তিনি আমে ছিটিয়ে পরে তা আড়তে বিক্রি করেন। তার মতো অনেক আম চাষীরাই গোপনে অপরিপক্ক আমে ক্যামিকেল স্প্রে করছে বলেও জানান কামরুল ইসলাম। এর আগে এসব মেডিসিন শুধু লিচুতে ব্যবহার হয়ে আসছিলো।

সাতক্ষীরার তুজুলপুর গ্রামের আম চাষী জাহেদুল মোড়ল জানান, ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির নয়টি গাছের আম তিনি এক সাথে বিক্রি করেছেন বরিশাল থেকে আসা ক্রেতা জুনাইদ নামের ব্যবসায়ীর কাছে। ক্রেতা গাছ থেকে আম পেড়েই ওষুধ স্প্রে করে প্লাষ্টিকে খাচায় ভরে ট্রাক লোড করে নিয়ে যায়। ক্রেতা জুনাইদ জানায়, আমের আঠা শুকানোর জন্য সে ওষুধ স্প্রে করেছে। এভাবে প্রশাসনের চোখ ফঁকি দিয়ে আমে ক্যমিকেল মিশিয়ে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আম কিনতে আসা আশশুনির রুহুল কুদ্দস একটি আমের ঝুড়ি এ প্রতিবেদককে দেখিয়ে বলেন, এটা অপরিপক্ক আম। মেডিসিন মেশানোর কারনে আমের অর্ধেকাংশ টক টকে লাল হয়ে গেছে। দু’এক দিনের মধ্যে ভিতরে সম্পূর্ন পেকে যাবে বিক্রেতার কথায় এসব আম কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশী লাভের আশায় কিছু কিছু আম চাষীদের সাথে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও মাটিতে আম বিছিয়ে বিষাক্ত রাসায়নিক স্প্রে করছে বড় বড় পাইকারদের কাছে বিক্রি করছে। শহরের পিটিআই স্কুল সংলগ্ন একটি খোলা মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে স্প্রে করার জন্য আম সাজিয়ে রাখা হচ্ছে।

জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষনের পরিদর্শক শেখ মনিরুজ্জামন জানান, গাছের সব আম পরিপক্ক হয়নি। বর্তমানে আম চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। বেশী লাভের আশায় অনেক আমা চাষী অপরিপক্ক আম পেড়ে রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে তা বাজারে বিক্রি করছে। এর সাথে এক শ্রেনীর স্থানীয় ব্যবসায়ী বা আড়তদার জড়িয়ে পাড়েছে। গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে তিন তথ্যানুন্ধানে তিনি এসব জানতে পেরেছেন। তিনি আরও জানান, সাতক্ষীরার আমের সুখ্যাতি নষ্ট করতে একটি চক্র কাজ করছে। সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড়বাজারের আশেপাশের অন্য ব্যবসায়ীরা জানান, পাইকাররা বাজার থেকে একটু দুরে অস্থায়ী ঘর নির্মান করে আম সাজিয়ে রাখছে। এসব জায়গায় অপরিপক্ক আমে গোপনে ক্যামিকেল মিশানো হচ্ছে। পরে সুযোগ বুঝে ক্যামিকেল মেশানো এসব আম ট্রাকে করে পাঠানো হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। প্রতাক্ষদর্শীরা জানায়, রাতের আধারে বা নির্জনে বসে ক্যমিকেল মেশানোর পর ফ্যানের বাতাস দেয়া হয় আমে। পরে তা ট্রাক লোড করে পাঠানো হয় দেশেল অভ্যন্তরে।

সাতক্ষীরার আমের আড়ৎদার মদিনা ভান্ডারের মালিক কামরুল ইসলাম, তিথি ভান্ডারের মালিক সিরাজ মাহমুদ, আমজিরা ভান্ডারের মালিক আবু সাঈদসহ কথা হয় আরো অনেকের সাথে। তারা জানান, ক্ষতিকর ক্যামিকেল মেশানো আম সাতক্ষীরার বাজারে বিক্রি হয় না। বাজারে বর্তমানে আমের ভিতরে ৫০ ভাগ কাঁচা ও ৫০ ভাগ পাকা দেখেই পাইকাররা আম কিনে থাকে। ক্রয় করা আম ট্রাকে লোড দিয়ে ঢাকা বা তাই বাইরে যেতে ৩/৪ দিন সময় লাগবে। ট্রাক থেকে তিন চার দিন পর আম আনলোড করার পর আমটি সম্পূর্ন পেকে যাবে। এ অবস্থায় আমে ক্ষতিকর ক্যমিকেল মেশানোর প্রয়োজনই নেই। তারা আরও জানান, বাজারে বর্তমানে প্রতিমন হিসসাগর আম ১৮ থেকে দুই হাজার টাকা, গোবিন্দভোগ ২০ থেকে ২২ শ’ টাকায়, গোপালভোগ ১৬ থেকে ১৯ শ’ টাকায় ও আটিগুটি সাত থেকে আটশ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সরেজমিনে জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম আমের আড়ত ঝাউডাঙ্গা বাজরের যেয়ে দেখা যায় এখানে ক্রেতা নেই। আমের আমদানি প্রচুর। কথা হয় আম ব্যবসায়ী ঢাকার যাত্রা বাড়ির খোকন মিয়া, নারায়ন গঞ্জের আহসান হাবিব, কিশোরগঞ্জের চানমিয়া, কমল সরকার, ঢাকা রামপুরার আব্দুর রহমানের সাথে। তারা জানান, ঢাকায় অভিযান চলছে। তাই তারা গত তিন চার দিন ধরে এখানে আম না কিনে বসে আছে। ঢাকার অভিযান বন্ধ হলে আম কিনবে। তারা জানান, অপরিপক্ক আম বিনা পয়সায়ও ট্রাকে তোলে না। যশোর, খুলনা, মাগুরা, ঝিনাইদহ এলাকার আমে কার্বাইডসহ বিবিন্ন ক্যামিকেল মিশানো থাকে। পদ্মা পার হলেই তারা সাবই সাতক্ষীরা আম বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। সে করনে ঢাকার বাজারে আমের ট্রাক ঢুকলেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই আম চাকায় পিষ্ট করে নষ্ট করে দেয়া হচ্চে। পরিস্থিতি ভালো না হলে আমের ব্যবসা তারা করবে ন। এ বাজারের আড়ৎদার আব্দুল খালেক জানান, পাইকাররা আম না কেনায় গত চার দিনে মন প্রতি আমের দাম এখানে চারশ’ থেকে সাতশ’ টাকা কমে গেছে। আম চাষীরা ক্ষতির মধ্যে পড়েছে।

বাজার মনিটরিং কর্মকর্তা আবু সালেহ জানান, মান সম্পন্ন আম দেশ বিদেশে রপ্তানীও শুরু হয়েছে। বাজারে কেমিক্যাল মিশ্রিত আম যাতে আসতে না পারে সেজন্য নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। সাতক্ষীরা আম ব্যবাসায়ী সমিতির সাধরণ সম্পাদক মো: রওশন আলী জানান, বাজারে বিষ মেশানো কোন আম নেই। সাতক্ষীরা আম ব্যবাসায়ী সমিতির সভাপতি বাদশা মিয়া জানান, চোরাইপাথে বা অন্যকোন উপায়ে ভারতীয় আম সাতক্ষীরায় আসে না। বাজারে ক্যামিকেল মেশানো আম বিক্রি হয় কি না তা তার জানা নেই। তিনি ক্ষোভোর সাথে জানান, রাজশাহী অঞ্চলের কিছু আম চাষী ও ব্যবসায়ীরা প্রশাসন ও মিডিয়াকে ভূল বুঝিয়ে সাতক্ষীরার আম চাষী ও বাজার ধ্বংস করার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। গত তিন বছর ধরে তারা এ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সব জায়গায় ক্রুটি বিচ্যুতি থাকবে, তবে ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হবে না।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ কাজী আব্দুল মান্নান জানান, সাতক্ষীরায় সাতটি উপজেলায় চলতি বছরে প্রাায় চার হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ১১৯৫ হেক্টর জমিতে, কলারোয়া উপজেলায় ৬০২ হেক্টর, তালা উপজেলায় ৭০৫ হেক্টর, দেবহাটা উপজেলায় ৩৬৮ হেক্টর, কালিগঞ্জ উপজেলায় ৮০৫ হেক্টর, আশাশুনি উপজেলায় ১২৫ হেক্টর ও শ্যামনগর উপজেলায় ১৫০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে আমের বাগন রয়েছে ১৫৩০টি, কলারোয়ায় ১৩১০টি, তালায় ১৪৫০টি, দেবহাটায় ৪৭৫টি, কালিগঞ্জে ১৪২টি, আশাশুনিতে ১৯০টি ও শ্যামনগর উপজেলায় ১৫০টি আমের বাগান রয়েছে। এ জেলায় গোবিন্দভোগ, হিমসাগর, গোপালভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাস, ক্ষিরসরাইসহ নানা জাতের আম বাগান রয়েছে। এদিকে ভোমরা স্থল বন্দরের ডেপুটি কমিশনার (কাষ্টমস) রেজাইল হকের সাথে। তিনি জানান, অন্যান্ন ফলের সাথে ভারত থেকে আমও আমদানী হয়ে থাকে। ফলের বেশীরভাগ আমদানীকারক ঢাকা, চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার। চলতি মাসে সাতক্ষীরার কোন ফল আমদানী কারক ভারত থেকে আম আমদানী করেনি।

লেখকঃমফস্বল সম্পাদক,কালের কণ্ঠ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৭-২০১৮. কৃষিসংবাদ.কম
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত)