এই পাতাটি প্রিন্ট করুন এই পাতাটি প্রিন্ট করুন

উপকূলীয় অঞ্চলে লবনাক্ততা বৃদ্ধি: কৃষিতে বিরুপ প্রভাব

Share

Salinity problemকৃষিবিদ মোঃ নূরুল হুদা আল্ মামুন*

উপকূলীয় অঞ্চলে লবনাক্ততা
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ত এলাকা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমাঞ্চলের এলাকা -গুলোতেও। লবণের বিরুপ প্রভাব পড়ছে কৃষি ব্যবস্থাপনা ও শস্য বিন্যাসে। বাংলাদেশের মোট আবাদযোগ্য ভূমির শতকরা ৩০ ভাগ জমি উপকূল এলাকায়। উপকূলীয় ২.৮৫ মিলিয়ন ২৮.৫ লাখ হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ০.৮৩ মিলিয়ন ৮.৩ লাখ হেক্টর জমিই  লবণাক্ততা দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হয়। গত চার দশকে দক্ষিনাঞ্চলে লবণের মাত্রা বেড়েছে ২৬ শতাংশ। আর গত এক দশকে মাত্রা বেড়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৭৩ সালে মৃত্তিকা সম্পদ উন্ন্য়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) পরিচালিত জরিপে দেখা যায়,দেশের ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর আবাদি জমির মাটিতে লবণ রয়েছে। ২০০০ সালের জরিপে দেখা যায়,এই সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর। বর্তমানে লবণের  আওতায় জমি রয়েছে ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর। গত ১০ বছরে লবণের এলাকা বেড়েছে ৩৫ হাজার ৫১ হেক্টর। বাংলাদেশ বর্তমানে ৯৩টি উপজেলা এবং ১৮টি জেলায় লবণাক্ত মাটি আছে। তম্মধ্যে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ভোলা, লক্ষীপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বরগুনা পিরোজপুুর ও খুলনা অন্যতম। বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন, উপকূল থেকে যেভাবে লবণ পশ্চিমাঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে তাতে আগামী কয়েক দশকে তিন কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে।

লবণাক্ত মাটি ঃ যে মাটিতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে সাংঘাতিকভাবে বাধা দেয়ার মতো নিরপেক্ষ দ্রবণীয় উপাদান যেমন-ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়ামের ক্লোরাইড ও সালফেট  প্রচুর পরিমাণে থাকে; কিন্তু মাটির ধর্ম  পরিবর্তন করার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে সোডিয়াম থাকে না। তাকে লবণাক্ত মাটি বলে। এই মাটির দ্রবণে যে দ্রবণীয় লক্ষণ থাকে তার অর্ধেকেরও বেশি সোডিয়াম। ফলে বেশ কিছু  পরিমাণ লক্ষণ মাটির কলয়েডের বাইরে থাকে এবং দূও হতে দেখলে মাটির ওপর সাদা সারের স্তরের মত দেখা যায়। এ জন্য একে অনেকে সাদা সার মাটি বলে।
লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণ ঃ দক্ষিণাঞ্চলে লবণ প্রধানত দুইভাবে ছড়াচ্ছে। সমুদ্রের পানিতে প্লাবিত হয়ে এবং মাটির নিচের স্তর থেকে ওপরে উঠে  এসে। মার্চ ও এপ্রিলে জোয়ারের পানি এসে দক্ষিনাঞ্চলে যে সব আবাদি জমি তলিয়ে যায়, সে সব মাটিতে লবণ ছড়িয়ে পড়ে।এ পানিতে ক্ষতিকর মাত্রার লবণ থাকে। এ পানি সেচ কাজে  ব্যবহার করা হলে মাটি লবণাক্ত হয়। আবার ডিসেম্বর থেকে শুরু করে র্ফেরুয়ারি-মার্চে জমি মুকিয়ে যায়। এ সময় মাটির ক্যাপিলারি পোর দিয়ে ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি মাটির ওপরে চলে আসে। ওপরে আসার পর পানি রোদে ও তাপে বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, এভাবে লবণ জমাট বদ্ধ হয়ে থাকে। তবে সাতক্ষীরায় লবণ ছড়ানোর জন্য দায়ী চিংড়ি চাষিরা। তারা চিংড়ি চাষের জন্য আবাদি জমিতে লবণ পানি  প্রবেশ করাচ্ছে। এ কারণে ওই সব এলাকার মাটিতে লবণের মাত্রা বেশি।
শুষ্ক মওসুমে লবণ ছাড়া পানি মেলে না দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে। এ কারণে চারদিকের খাল-নদীতে পানি থাকা সত্বেও সেচ দিতে পারছে না কৃষকরা। যারা নিয়ম না মেনে জমিতে সেচ দেন, তাদের জমিই হয়ে পড়ে লবণাক্ত। বরিশালের আড়িয়ালখাঁ, ঝালকাঠির বিশখালী, পিরোজপুরে বলেশ্বর নদী থেকে লবণ আসে। আর সেচের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মাটিতে। বরিশাল সদর, বাকেরগঞ্জ, ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া, রাজাপুর ও নলছিটি এবং কাউখালি ও নেছারাবাদে বেশিরভাগ উপজেলার মাটিতে লবণের মাত্রা বাড়ছে নদী থেকে আসা লবণ পানির মাধ্যমে।
লবণাক্ততায় কৃষির ক্ষতিঃ কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন, লবণের কারণে ফসলের উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমে যায়। অনেক সময় কোন উৎপাদনই হয় না। লবণের প্রভাবে মাটির উর্বরতা এবং গাছের বৃদ্ধি কমে যায়, ফুল আসে না, পরাগায়নের উন্নয়ন হয় না। রোপা আমনে তেমন ক্ষতি না হলেও রবিশস্য লবণ সহ্য করতে পারে না। কুশি কম হয়। লবণ বিস্তারের কারণে তিন ফসলী জমি এক ফসলী হয়ে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে শস্য বিন্যাস। লবণাক্ততার কারণে গত পাঁচ বছরে ঝালকাঠিতে আবাদি জমি কমে এসেছে ১ হাজার হেক্টর। ধানের উৎপাদন কমেছে ৫ হাজার টন। শাক-সবজির উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জন্য অপেক্ষা করছে অশনি সংকেত। মাটি লবণাক্ত হওয়ার ফলে মৃত্তিকা দ্রবণের ঘনত্ব বেশি থাকে। তখন গাছ থেকে অল্প ঘনত্বের গাছের রস মাটিতে চলে যায়। ফলে গাছ পানি শুন্য হয় এবং ঢলে পড়ে। লবণাক্ত মাটিতে দ্রবীভূত লবণের পরিমাণ বেশি থাকে বলে গাছ মাটি থেকে খাদ্য উপাদান ও পানি উভয়ই সহজে শোষণ করতে পারে না। এ ছাড়া শোষিত উপাদানসমূহের আত্তীকরণেও প্রতিকূলতার সৃষ্টি হয়। মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং জিঙ্কের পরিমাণ কমে যায়। মাটির লবণাক্ততার ফলে বীজের অঙ্কুরোদগম হার কমে যায় এবং গাছের বৃদ্ধি কমে যায় ফলে ফলন কমে যায়।

মাটির লবণাক্ততা দূরীকরণে করণীয়ঃ লবণাক্ত মাটিকে চাষাবাদের উপযোগী করার জন্য দ্রবণীয় লবণীয় লবণকে মাটি থেকে সরিয়ে দিতে হবে। নিম্মলিখিতভাবে লবণাক্ত মাটিকে পুনরুদ্ধার বা পরিশোধন করা যায়; যথা-
১. যদি জমির ওপর খুব বেশি লবণ জমে যায় তবে তা চেঁচে পরিষ্কার করলে লবণাক্ততা কমে যায়। অনেক সময় লবণ পরিষ্কার করার পর অন্যস্থান থেকে অলবণাক্ত মাটি এনে ভরাট করা হয়। পানির সাথে লবণ উঠে আসার ফলে কয়েক দিন পর জমি আবার লবণাক্ত হয়ে পড়ে। এই পদ্ধতি সীমিত ছোট এলাকার জন্য প্রযোজ্য।
২.বাষ্পায়ন হ্রাস পেলে অন্তর্ভূমি হতে লবণ-ভূত্বকে উঠে আসে না। এ জন্য মালচিং এবং বিভিন্ন ধরনের বাষ্পরোধক ব্যবহার করে মাটির লবণাক্ততা কমানো যায়।
৩. ভূগর্ভস্থ পানির উচ্চতা ৮-১০ ফুট নিচে থাকা উচিত। পানি নিষ্কাশনের দ্বারাই পানির উচ্চতাকে সুবিধাজনকভাবে নিচে রাখা। পানি নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য টালি নালা, খোলা নালা, আবৃত্ত নালা, কুয়া হতে পাষ্প করে পানি বের করে দেয়া যায়।
৪. প্লাবন সেচের মাধ্যমে লবণজাতীয় পদার্থগুলোকে পানিতে দ্রবীভূত করা হয় এবং প্লাবনের মাধ্যমে এই দ্রবীভূত লবণগুলোকে ধুয়ে জমি থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। এরূপ জমিতে সমন্বিত রেখা বরাবর ছোট ছোটভাবে বিভক্ত করে নেয়া হয় এবং প্রত্যেক জমিতে আইল বেঁধে উঁচু করা হয়। এরপর ঢালের আড়াআড়িভাবে ভেলির মতো করে দেয়া হয়। এরপর পানি সেচ করে প্রতিটি জমি ভালোভাবে প্লাবিত করে দিতে হয়।
৫. বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জমির লবণ হ্রাস করার পর লবণ সহ্য করতে পারে এমন ফসল (ধান:বিআর-২৩, ব্রিধান-৪০, ব্রিধান-৪১, ব্রিধান-৪৭, তিল, চীনাবাদাম) চাষ করতে হবে। এ ছাড়া জৈব ও সবুজ সার মাটিতে প্রয়োগ করলে তা থেকে যে কার্বন-ডাই অক্সাইড বের হয় তা লবণাক্ততা কমাতে সাহায্য করে।
৬. যেহেতু উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ত পানি দ্বারা বাগদা চিংড়ি চাষের ফলে লবণাক্ততা বাড়ছে তাই এর পরিবর্তে মিষ্টি পানির গলদা চিংড়ি চাষ করা যেতে পারে। এভাবে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে লবণাক্ত মাটিকে চাষাবাদের উপযোগী করে তোলা যায়।
সম্ভাবনা ঃ লবণ সহ্য করতে পারে এমন ধান ব্রি ধান-৪৭ এবং বিনা ধান-৮ কৃষক পর্যায়ে রয়েছে। এ ধান সর্বোচ্চ ১২ ডিএস/এম মাত্রার লবণ সহ্য করতে পারে। কিন্তু শুষ্ক মওসুমে দক্ষিণাঞ্চলের বেশিরভাগ মাটির লবণের মাত্রা ১৬ বা তার বেশি হয়। ফলে ওইসব এলাকায় এ ধানের আবাদ অলাভজনক হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে আগামীতে অধিক মাত্রার লবণ সহ্য করতে পারে এমন ধানের জাত উদ্ভাবন শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
পরিশেষে, দেশের উপকূল অঞ্চলে যে হারে লবণাক্ততা দিন দিন বেড়ে চলেছে সেই হারে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। বরং কৃত্রিম উপায়ে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি দ্বারা বাগদা চিংড়ি চাষের ফলে লবণাক্ততা আরো বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে যত দ্রুত লবণাক্ততা দূরীকরণে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় ততই মঙ্গলজনক।

কৃষির আরো খবর জানতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিনঃকৃষিসংবাদ.কম

আরও পড়ুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৭-২০১৮. কৃষিসংবাদ.কম
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত)