এই পাতাটি প্রিন্ট করুন এই পাতাটি প্রিন্ট করুন

জেনে নিতে পারেন জানুয়ারি মাসের কৃষিতে করণীয় কাজ সমূহ

কৃষিবিদ ড. এম. এ.মান্নানঃ   কুয়াশা-ঢাকা, শিশির মাখা এ মাসে বাঙলার কৃষাণ-কৃষানীর মনে দোলা দেয় পৌষ পার্বণের আনন্দ। সুপ্রিয় পাঠক, সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি জানুয়ারি মাসের কৃষি।

ধান

এ সময়ে বোরো ধাBoro Rice cultivation 300x199 জেনে নিতে পারেন জানুয়ারি মাসের কৃষিতে করণীয় কাজ সমূহনের বীজতলার যত্ন নিতে হয়ে। আপনার বীজতলায় প্রয়োজনীয় সেচ দিন। কারণ বীজতলা শুকিয়ে গেলে চারার শিকড়গুলো লম্বা হয়ে যায়। এতে চারা তোলার সময় শিকড় ছিঁড়ে যেতে পারে। আবার বীজতলায় কোন কারণে পানি জমে গেলে তা বের করে দিতে হবে। বীজতলার চারার পুষ্টির অভাবে লাল হয়ে গেলে সামান্য ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিন। শীতের প্রাদুর্ভাব বেশি হলে রাতে পলিথিন শিট বা কলাপাতা দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখুন। মনে রাখবেন সুস্থ সবল চারা অধিক ফলনের পূর্বশর্ত।

চারার বয়স ৪০-৪৫ দিন হলে মূল জমিতে চারা রোপণ শুরু করতে পারেন। এ জন্য জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে পানিসহ কাদা করতে হবে। চাষের আগে জমিতে জৈব সার দিতে হবে এবং শেষ চাষের আগে দিতে হবে ইউরিয়া  ছাড়া অন্যান্য রাসায়নিক সার। পরে ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হবে। জমির উর্বরতার উপর সারের মাত্রা নির্ভর করে। গড়ে প্রতি হেক্টর জমির জন্য সারের পরিমাণ হলো-জৈব সার ৫ মেট্রিক টন, ইউরিয়া ২২০-২৭০ কেজি, টিএসপি ১২০-১৩০ কেজি, পটাশ সার ৮৫-১২০ কেজি, জিপসাম ৬০-৭০ কেজি, দস্তা ১০ কেজি। বীজতলা থেকে সাবধানে চারা তুলে এনে মূল জমিতে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২৫ সেন্টিমিটার এবং গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার বজায় রেখে চারা রোপণ করুন। প্রতি গোছায় ২-৩ টি সুস্থ চারা রোপণ করলে ফলন ভালো হয়। আজকাল এক চারা পদ্ধতিতে (এসআরআই পদ্ধতি) ধান চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে ১০-১২ দিন বয়সী চারা একটি একটি করে রোপণ করতে হয়। এতে বেশ ভালো ফলন পাওয়া যায়। ইদানিং ড্রাম সিডার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ড্রাম সিডার মূলত কাদা জমিতে অঙ্কুরিত ধান বীজ বোনার কাজে ব্যবহৃত হয়। আপনি ইচেছ করলে ড্রাম সিডার দিয়ে অঙ্কুরিত রোরো ধান বীজ বুনতে পারেন। এত অল্প সময়ে অধিক জমিতে অঙ্কুরিত ধান বীজ বোনা সম্ভব। ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি অঙ্কুরিত ধান বীজ বোনা যায় বলে আলাদা বীজতলা থেকে চারা উত্তোলন, চারা রোপন এসব আনুষঙ্গিক কাজগুলো করতে হয় না। ফলে শ্রম ও খরচ দুই কম লাগে। আবার সরাসরি বপনের ক্ষেত্রে ১০ দিন আগে ধান পেকে যায় এবং শতকরা ১০-১৫ ভাগ ফলন বেশি হয়। তাই আপনি ড্রাম সিডার দিয়ে অঙ্কুরিত ধান বীজ জমিতে বপণ করতে পারেন। এ জন্য আপনাকে কিছু বিষয় অনুসরণ করতে হবে, যথা-

             জমিতে ভালোভাবে চাষ দিয়ে জমির আগাছা ও আবর্জনা পচিয়ে ফেলুন;

             মই দিয়ে জমি সমান করুন যেন অঙ্কুরিত ধান বীজ বোনার সময় জমির কোথাও পানি জমা না থাকে;

             উন্নতজাতের সুস্থ সবল বীজ সংগ্রহ করে জাগ দিবেন যাতে বীজগুলো ভালোভাবে অঙ্কুরিত হয়।

             অঙ্কুরিত ধান বীজ নিয়ে ড্রাম সিডারের ড্রামের চার ভাগের তিন ভাগ ভর্তি করুন এবং বাকি একভাগ খালি রাখুন।

             অঙ্কুরিত ধান বীজ ড্রাম সিডারে রাখার আগে দুই ঘন্টা খোলা বাতাসে রেখে দিন।

             ড্রাম সিডার জমিতে নিয়ে যান এবং বপন কাজ শুরু করুন। আপনি ড্রাম সিডার দিয়ে এক সঙ্গে বারটি সারিতে অঙ্কুরিত ধান বীজ বুনতে পারবেন।

             প্রথম দিকে জমি যেন সব সময় কাদা কাদা থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।

             চারার উচ্চতা বাড়ার সাথে সঙ্গতি রেখে জমিতে সেচ দিন।

             মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট থেকে আপনার জমির মাটি পরীক্ষা করে অনুমোদিত মাত্রায় সার দিন। আগাছা পরিষ্কার করুন নিয়মিত। ইউরিয়ার পরিবর্তে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করা ভাল গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলে স্বাভাবিক ইউরিয়া ব্যবহার করতে হবে না। এবং চারা রোপনের ১০দিন পর প্রতি চারটি গোচার মধ্যস্থানে ১টি করে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হয়।

গম

গমের জমিতে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সেচ দেয়ার উপযুক্ত সময় এখন। চারার বয়স ১৭-২১ দিন হলে গম ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করে হেক্টর প্রতি ৩০-৫০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ সেচ দিন। সেচ দেয়ার পর জমিতে জোঁ আসলে মাটির উপর চটা ভেঙে দিতে হবে। তাছাড়া গমের জমিতে যেখানে ঘনচারা রয়েছে সেখানের কিছু চারা তুলে পাতলা করে দিন।

ভূট্টা

গমের মতোই ভূট্টা জমির আগাছা পরিষ্কার করুন এবং অতিরিক্ত চারা তুলে ফাঁকা স্থানে লাগিয়ে দিন এবং ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করুন। এ সময় চারার গোড়ায় মাটি তুলে দিন এবং প্রয়োজন মাফিক সেচ প্রয়োগ করুন।

আলু

আলুর চারা গাছের উচ্চতা ১০-১৫ সেন্টিমিটার হলে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করুন। দুই সারির মাঝে সার দিয়ে কোদালের সাহায্যে মাটি কুপিয়ে সারির মাঝের মাটি গাছের গোড়ায় তুলে দিতে হবে। ১০-১২ দিন পরপর এভাবে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিন। তা না হলে গাছ হেলে পড়বে এবং ফলন কমে যাবে। মেঘলা আবহাওয়ায় বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে গেলে আলুর ‘নাবী ধসা’ রোগ হতে পারে। আক্রমণের তীব্রতা বেশি হলে ফলন খুবই কম হয়। এ জন্য অনুমোদিত ছত্রাকনাশক সঠিক মাত্রায় জমিতে ভালোভাবে স্প্রে করুন। তাছাড়া। আলু ক্ষেত্রে সেচ প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার ও মালচিং সঠিকমতো করুন। অধিক ফলন পাবেন আশা করি।

শাকসবজি

শীতকাল শাকসবজির মৌসুম। এ সময় নানান সবজিতে ক্ষেত ভরে থাকে। নিয়মিত পরিচর্যা করলে শাকসবজির বেশি ফলন পাওয়া যায়। শাকজাতীয় ফলন যেমন- লালশাক, মূলাশাক, পালংশাক, বাটিশাক, সর্ষেশাক, ধনেপাতা, একবার শেষ হয়ে গেলে আবার বীজ বুনে দিন। অল্প দিনেই আবার ফলন পেয়ে যাবেন। এছাড়া ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, ওলকপি, শালগম, গাজর, শিম, লাউ, কুমড়া, মটরশুটি এসবের নিয়মিত যতœ নিন। শীতকালে মাটিতে রস কমে যায় বলে সবজি ক্ষেতে নিয়মিত সেচ দিতে হয়। তাছাড়া আগাছা পরিষ্কার, গোড়ায় মাটি তলে দেয়া, সারের উপরি প্রয়োগ, রোগ পোকা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

ডাল ও তেল ফসল

এখন বিভিন্ন রকম ডাল ফসল যেমন- মশুর, মুগ, মাসকলাই, খেসারি, মটর, ফেলন, সয়াবিন এবং তেল ফসল যেমন- সরিষা, তিল, তিসি ফসলের বাড়ন্ত পর্যায়। প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করলে এসবের ফসলের ভালো ফলন আশা করা যায়।

তুলা

তুলার জমিতে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করুন, আগাছা দমন করুন মরা ও রোগক্রান্ত ডালপালা কেটে ফেলুন। তাছাড়া পোকা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থপনা বা আইপিএম ব্যবহার করুন।

গাছপালা

গত বর্ষায় রোপণ করা ফল, ওষুধি বা বন গাছের যতœ নিতে হবে এখন। গাছের গোড়ায় মাটি আলগা করে দিন এবং আগাছা পরিষ্কার করুন। প্রয়োজনে গাছকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিন। রোগাক্রান্ত গাছের আক্রান্ত ডালপালা ছাঁটাই করে দিন। শীতকালে গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি সেচ দিন।

পশুসম্পদ

শীতকালে আপনার পশুপাখির যতœ দিন। গবাদিপশুর টিকা দিয়ে নিন এবং কৃমির ওষুধ খাওয়ান। বিশেষ করে ক্ষুরা, তড়কা, গালফুল এসব রোগের আক্রান্ত থেকে প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন দিন। প্রয়োজনে উপজেলা পশুসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করে আপনার চাহিদামফিক পরমর্শ গ্রহণ করুন।

শীতে মাছের কম হয়। খাদ্য খেতেও মাছের অনীহা থাকে। তাছাড়া শীতে মাছের ক্ষতরোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এ সময় মাছের বিশেষ যতœ নেয়ার প্রয়োজন পড়ে। পুকুরে মাছের প্রয়োজনে চুন, সার, সম্পূরক খাবার এসব পরিমাণমত দিন। পুকুরে যাতে রোদ পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখুন। আর মাছ  চাষসংক্রান্ত যে কোন পরামর্শের জন্য উপজেলা মৎস অফিসে যোগাযোগ করুন।

প্রিয় পাঠক, কৃষিবিষয়ক পরামর্শ জানতে আপনার নিকটস্থ উপসহকারী কৃষি অফিসারের সঙ্গে কথা বলুন। সমৃদ্ধ দেশ গড়তে ব্যবহার করুন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি। আবার কথা হবে আগামী মাসের কৃষি নিয়ে। সবাই সুস্থ থাকুন, এই প্রত্যাশা নিয়ে শেষ করছি।

কৃষির আরো খবর জানতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিনঃকৃষিসংবাদ.কম


আরও পড়ুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৬-২০১৭. কৃষিসংবাদ.কম
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত)