এই পাতাটি প্রিন্ট করুন এই পাতাটি প্রিন্ট করুন

প্লান্ট ক্লিনিকের কৃষি বিষয়ক পরামর্শ সেবাসহ ব্যবস্থাপত্রে লাভবান হচ্ছেন কৃষক

Share

 প্লান্ট ক্লিনিকের কৃষি বিষয়ক পরামর্শ
মোঃ মোশারফ হোসেন, (শেরপুর) :

প্লান্ট ক্লিনিকের কৃষি বিষয়ক পরামর্শ

কৃষি প্রধান এদেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকা শক্তি হলো কৃষি খাত। জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান অপরিসীম। আর তাইতো এ খাতকে আরও দ্রুত সচল করতে বিভিন্ন প্রশিক্ষনের মাধ্যমে কৃষকদের দক্ষ ও অভিজ্ঞ করে গড়ে তোলার পাশাপাশি কৃষকদের দোরগোড়ায় কৃষিসেবা পৌঁছে দিতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম চালু করছে সরকার। তার অংশ হিসেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের ১০টি জেলার দুইটি করে মোট ২০ উপজেলাকে পাইলট প্রকল্পের আওতায় এনে প্লান্ট ক্লিনিকের মাধ্যমে কৃষকদের কৃষি বিষয়ক পরামর্শ সেবাসহ ব্যবস্থা পত্র দিচ্ছেন। এই ক্লিনিকের সেবা নিয়ে আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন হাজারো প্রান্তিক কৃষকসহ সবশ্রেণির কৃষি পরিবার। এতে কৃষকের বেচে যাচ্ছে সময়, শ্রম ও টাকা। এই ক্লিনিকের সেবা নিয়ে নিরাপদ ফল, ফসল ও শাক সবজি উৎপাদন করছেন চাষি ভাইয়েরা। কৃষিতে বাড়ছে জৈব বালাই নাশকের ব্যবহার। ফলে একদিকে লাভবান হচ্ছেন কৃষক, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি সচল হচ্ছে, আর ভোক্তারা পাচ্ছেন নিরাপদ শাক সবজি, ফল ও ফসল।

এখানে গল্পে গল্পে কৃষকদের উন্নত চাষাবাদের মাধ্যমে ফল ও মাঠফসল উৎপাদনের বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ সেবা দেওয়াসহ ফল ও ফসলে যে কোন রোগ বালাইয় দমন ও পূর্ব প্রস্তুতিতে লিখিত ব্যবস্থা পত্র দেওয়া হয়। দিন দিন এই ক্লিনিক কৃষকদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠছে। একই সমস্যা অনেক কৃষকদের ক্ষেতে দেখাদিলে একজন কৃষক ওই ক্লিনিক থেকে ব্যবস্থা পত্র নিয়ে অন্যদের জানিয়ে দেন। এতেকরে ব্যবস্থা পত্রের জন্য সব কৃষকদের আসা-যাওয়ায় সময় নষ্ট করতে হয়না। ফলে বেশি বেগ পেতে হয়না ক্লিনিক পরিচালনাকারী কৃষিবিদদেরকে। এমন কার্যক্রম চলছে দেশের ২০ উপজেলার মধ্যে শেরপুর জেলার নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলায়।

প্রধান মন্ত্রী জন নেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। দোড়গোড়ায় পৌঁছে গেছে কৃষি সেবা কার্যক্রম। তার অংশ হিসেবে ২০১৫ সালের মে মাস হতে শেরপুর জেলার নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলার দুইটিকরে ব্লকে প্লান্ট ক্লিনিকের মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপত্র প্রদান কাজ চলছে। নকলা উপজেলায় এপর্যন্ত দেড় সহস্রাধিক কৃষি পরিবার প্লান্ট ক্লিনিকের ব্যবস্থা পত্র নিয়ে সে মতে কাজে লাগিয়ে লাভবান হয়েছেন।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, উপজেলায় একটি পৌরসভা ব্লক ও ৯ টি ইউনিয়নের ২৭টি ব্লকসহ মোট ২৮টি ব্লকে মোট ৩২ হাজার ৪৫টি কৃষক পরিবার রয়েছে। কৃষি প্রশিক্ষণ ও কৃষকদের সেবাদানের সুবিধার্থে এইসব ব্লকে ভাগ করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হুমায়ুন কবীর। তিনি আরও জানান, উপজেলার ২৮ টি ব্লকের মধ্যে পাইষকা ও গৌড়দ্বার ব্লকে ২০১৫ সালের মে মাস হতে প্রতিমাসে দুই দিন করে পাইষকা ব্লকে মাসের প্রথম ও তৃতীয় সোমবার এবং গৌড়দ্বার ব্লকে মাসের দ্বিতীয় ও চতুর্থ সোমবার কৃষিবিদদের সমন্বয়ে প্লান্ট ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রায় দুই হাজার কৃষককে ফল ও ফসলের বিভিন্ন সমস্যা জনিত কারনে ব্যবস্থা পত্র দেওয়া হয়েছে। আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ও প্রযুক্তি গ্রামের সব কৃষকদের মাঝে পৌঁছে দেওয়াসহ কৃষি উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই উদ্যোগ হাতে নিয়ে পাইলট প্রকল্প চালাচ্ছে বলে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাছাড়া ১৪২টি কৃষক মাঠ স্কুলের মাধ্যমে গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার কৃষক কৃষানিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রতিটি ৫০ জন প্রশিক্ষানার্থীর স্কুলে ২৫ জন কৃষক ও ২৫ জন কৃষানি এবং ২৫ জনের স্কুলে কমপক্ষে ৫ জন কৃষানিকে প্রশিক্ষন দেওয়া হয়।

উপজেলা প্লান্ট ক্লিনিকের কো-অর্ডিনেটর ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল ওয়াদুদ জানান, প্লান্ট ক্লিনিকের জন্য আলাদা জনবল না থাকায় নির্দিষ্ট দিনে অফিসের অন্য কাজ রেখে শুধু প্লান্ট ক্লিনিকে থাকতে হয়। এতেকরে অন্যদিকে কৃষি সেবায় কিছুটা হলেও বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। এই ক্লিনিকের জন্য প্রতি ব্লকে আলাদা জনবল, অবকাঠামো ও ক্লিনিকের মাধ্যমে দৈনিক সেবাদান নিশ্চিত করতে পারলে কৃষি উন্নয়নে আন্তর্জাতিক ভাবে খ্যাতি অর্জন করা সম্ভব বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, মাসে দুই দিন ছাতার নিচে বসে সেবাদান করায় অনেক কৃষক দিন তারিখ ভুলে যান। ফলে কৃষি মাঠে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও প্লান্ট ক্লিনিকের সেবা থেকে বঞ্চিত হন কৃষক।

উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরকক্ষণ কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুর রাজ্জাককে আমি সাথে নিয়ে মাসে দুই দিন করে পাইষকা ও গৌড়দ্বার ব্লকে মোট চারদিন প্লান্ট ক্লিনিক পরিচালনা করি। এতে কৃষকরা বেশ উপকৃত হচ্ছেন। পাইষকা ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুর রাজ্জাক জানান, তিনি ওই ক্লিনিক সেবায় কৃষকরে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। একবার কোন সমস্যা দেখা দিলে যে ব্যবস্থা পত্র করেদেওয়া হয়, তার পরের বছর একই সমস্যা দেখা দিলে কৃষরা আর হতাশ হননা। মোবাইলের মাধ্যমইে ওই সমস্যায় আগের ব্যবস্থা পত্র অনুযায়ী কাজ করলে হবে কিনা তা জেনে নেন। তার মানে প্রতিটি কৃষক দিন দিন কৃষি ডাক্তারে পরিণত হচ্ছেন।

প্লান্ট ক্লিনিক হতে সেবা প্রাপ্ত পাইষকা ব্লকের কৃষক হযরত আলী, দুলাল মিয়া, লাল মিয়া, শাহজাহান, মোফাজ্জল; গৌড়দ্বার ব্লকের কৃষক নবী হোসেন, সুজন, লিয়াকত আলী, দুলাল জালালসহ অনেকেই জানান, বাড়ীর কাছে প্লান্ট ক্লিনিকের সেবা পাওয়ায় তাদের সময়, শ্রম ও টাকা বেচে যাচ্ছে। তাছাড়া তারা সবাই যেন কৃষি ডাক্তারে পরিণত হয়ে যাচ্ছেন।

ভুরদী খন্দকার পাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদক কল্যান সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ছাইদুল হক, সাধারণ সম্পাদক হেলাল, সহ-সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন, সদস্য ঈসমাইল, নাছিমা ও তাহমিনা; পোলাদেশী অগ্নীবিনা ক্ষুদ্র কৃষক আইপিএম ক্লাবের সভাপতি কিতাব আলী ও সাধারণ সম্পাদক হালিমসহ অনেকের সাথে কথা হলে তারা জানান, বসতবাড়িতে বা উপযুক্ত জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে ধান ও শাক সবজি চাষ, ফলজ ও কাঠ বাগান করা ও পরিচর্যা, ফসলের পোকামাকড় দমন পদ্ধতি ও এসবের উপকার ও অপকারসহ ফল-ফসলের বিভিন্ন রোগের লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছেন। এখন আর সাধারণ সমস্যায় কৃষি কর্মকর্তা বা পশু ডাক্তারের কাছে দৌঁড়াতে হয়না। নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই অনেক সমস্যার সমাধান দিতে পারেন তারা। এতে করে তাদের টাকা, শ্রম ও সময় বেচে যাচ্ছে। অন্যান্য কৃষকদের ফল ও ফসল কোন সমস্যা হলে তাদের কাছে পরামর্শ নিতে আসেন। তাদের পরামর্শে অনেকেই উপকৃত হয়েছেন। পরামর্শ নিতে আসা কামাল, শহিদুল, আলমগীর, মনিরসহ অনেকেই জানান, তারা যেকোন কৃষি সমস্যায় ভূরদী খন্দকার পাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদক কল্যান সংস্থা হতে পরামর্শ নিয়ে থাকেন। তারা বলেন, কৃষি মাঠ স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রতিটি কৃষক নিজেদের অনেক কৃষি সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে পারেন। আর যদি দেশের প্রতিটি ব্লকে প্লান্ট ক্লিনিক স্থাপন করা হতো তাহলে কৃষি উন্নয়নে দ্রুত বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হতো। কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্রুত সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক ভাবে খ্যাতি অর্জন করতো বলে মনে করেন তারা।

যেসব এলাকায় প্লান্ট ক্লিনিক আছে সেসব এলাকায় ওই ক্লিনিকের সুফলতায় কৃষি খাতে উৎপাদন ও আয় পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। এ উদ্যোগ সারা দেশের প্রতিটি গ্রামে ছড়িয়ে দিতে পারলে কৃষি উন্নয়নে আমাদের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন থাকবে বলে মনে করছেন কৃষি গবেষক, কৃষি বিজ্ঞানীসহ সুধীজনরা।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৬-২০১৭. কৃষিসংবাদ.কম
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত)