এই পাতাটি প্রিন্ট করুন এই পাতাটি প্রিন্ট করুন

ফসল উৎপাদনে মাটি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও করনীয়

Share

ড. মোঃ আনিছুর রহমানঃ

Soil Sample collectionমাটি একটি প্রাকৃতিক বস্তু, যা ফসল/উদ্ভিদকে ধারনসহ উর্বরতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ও পানির যোগান দিয়ে থাকে। এ মাটিই ফসল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ। এ স্পরে সুষ্ঠু ব্যবহারে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং ফসলের ফলন বেশি হয়। মাটিতে গাছের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান বিভিন্ন অবস্থায় ও আনুপাতিক হারে বিদ্যমান থাকে। এ মাটি হতে গাছ তাঁর বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য ১৭টি অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের মধ্য ১৪টি উপাদান পেয়ে থাকে। কিন্তু অসমহারে যথেচ্ছভাবে সার ব্যবহার করে নিবিড় চাষাবাদের কারণে মাটিতে গাছের জন্য প্রয়োজনীয় ১৪ টি পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতি আশংখাজনক হারে হ্রাস পাওয়ায় সুষম হারে সার ব্যবহার একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, এক হেক্টর জমি থেকে ধান ফসল (ধানের ফলন ৬ টন/হেক্টর) বছরে ১০৮ কেজি নাইট্রোজেন, ১৮ কেজি ফসফরাস, ১০২ কেজি পটাসিয়াম এবং ১১ কেজি সালফার গ্রহণ করে থাকে। এ থেকে ধারণা করা যায় মাটির স্বাস্থ্য প্রতি বছর কি হারে খারাপ হচ্ছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাটিকে সংরক্ষণ করে সীমিত জমি (০.০৬ হেক্টর/মাথাপিছু) থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণে ফসল উৎপাদনের জন্য মাটিকে বিচক্ষণতার সাথে ব্যবহার করা দরকার। আরো উল্লেখ্য যে, মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুনাবলি ফসল উৎপাদনের উপযোগী হলে ফসলের ফলন ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষকের আয় বাড়ে এবং দারিদ্র্য বিমোচন তরান্বিত হয়। তাই মাটির গুনাবলি কাঙ্খিতমানে বজায় রেখে ফসল উৎপাদন করা অতীব জরুরী। কিন্তু অপরিকল্পিত ব্যবহারে মাটির স্বাস্থ্য তথা মাটির উর্বরতা ক্রমশঃই নষ্ট হচ্ছে/কমে যাচ্ছে, ফলশ্র“তিতে মাটিতে ফসলের আশানুরূপ ফলন হচ্ছেনা। এর অন্যতম কারণ মাটিতে জৈব পদার্থসহ ফসলের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি রয়েছে। মাটিতে ঘাটতি পুষ্টি উপাদান সরবরাহের জন্য বিভিন্ন জৈব ও অজৈব উৎস থেকে জৈব সার, অণুজীব সার, রাসায়নিক সার, মিশ্র সার ও চুন প্রয়োগ করতে হয়। মাটিতে পরিমিত পরিমানে সার প্রয়োগ করা হলে মাটি ও ফসলের উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় মাটির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষতা বাড়ে এবং ফলশ্র“তিতে ফসল কাংখিত পরিমানের ফলন দিতে সক্ষম হয়। কিন্ত মাটিতে কি পরিমাণ পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি রয়েছে তা জানা না থাকলে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী পরিমাণমত সার প্র্রযোগ করা যায় না । তাই মাটিতে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী পরিমাণমত সার প্র্রয়োগের জন্য মাটি পরীক্ষার বিকল্প নাই। সুতরাং মাটির স্বাস্থ্য তথা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষন পূর্বক ফসলের চাহিদা অনুযায়ী পরিমাণমত সার প্র্রয়োগের জন্য মাটি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মাটি পরীক্ষাভিত্তিক সার প্রয়োগ ফসল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান শর্ত। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিটিউট-এর গবেষণাগারসমূহে মাটির নমুনা পরীক্ষা করে মাটির স্বাস্থ্য তথ্য জানা যায়।

মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়ার কারণ
মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ হচ্ছে-
ক্স অসমহারে ও যথেচ্ছভাবে রাসায়নিক সার প্রয়োগ;
ক্স প্রয়োজন নয় এমন রাসায়নিক সার প্রয়োগ;
ক্স জৈব সার ব্যবহার না করা বা কম করা;
ক্স ভেজাল ও বির্নিদেশ বর্হিভূত সার প্রয়োগ
ক্স ফসল চাষের নিবিড়তা বৃদ্ধি;
ক্স প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভূমি কর্ষন;
ক্স শস্য পর্যায় নীতি অনুসরণ না করা;
ক্স উফশী ও হাইব্রিড জাতের ফসলের আবাদ বৃদ্ধি;
ক্স ফসলের অবশিষ্ট্যাংশ জমিতে ব্যবহার না করা;
ক্স মাটির অম্লমাণ নিয়ন্ত্রণ না করা;
ক্স অতিরিক্ত হারে বালাইনাশক ব্যবহার করা:
ক্স মাটি পরীক্ষা না করে রাসায়নিক সার প্রয়োগ ইত্যাদি।

মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়ার ক্ষতিকর প্রভাব/অপকারিতা
মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হলে-
ক্স মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়।
ক্স মাটিতে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।
ক্স মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যায়।
ক্স মাটিতে উপকারী অণুজীবের সক্রিয়তা কমে যায়।
ক্স মাটিতে পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্যতাহীনতা দেখা যায়।
ক্স মাটিতে পুষ্টি উপাদানের বিষাক্ততার সৃষ্টি হতে পারে।
ক্স ফসলে পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
ক্স ফসলের ফলন ও গুনগতমান কমে যায়।
ক্স মাটি ব্যবস্থাপনাজনিত কারণে ফসলের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।

ফসল উৎপাদন ও মাটি পরীক্ষা
মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণসহ ফসলের অধিক ফলনের জন্য মাটি পরীক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাটি পরীক্ষা ব্যতিত জমিতে পরিমাণমত সার দেয়া যায় না। তাই সার সুপারিশ প্রদানের জন্য মাটি পরীক্ষা অবশ্যই করতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণসহ ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে  এসারডি আইয়ের ১৫টি আঞ্চলিক গবেষণাগারে মাটি পরীক্ষা করে পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে সার সুপারিশ প্রদান করা হয়।  মাটির স্বাস্থ্য তথ্য জেনে পরিমানমত সার প্রয়োগ করে ফসলের ফলন ও উৎপাদন বৃদ্ধি করা।

মাটি পরীক্ষা করা হলে –
ক্স মাটির অম্লমান জানা যায়।
ক্স মাটিতে বিদ্যমান জৈব পদার্থের পরিমান জানা যায়।
ক্স মাটির উর্বরতা পরিমাপ/মূল্যায়ন করা যায়।
ক্স মাটিতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানের পরিমান জানা যায়।
ক্স মাটিতে ডলোমাইট লাইম (ডলোচুন) বা কৃষিচুন প্রয়োগের প্রয়োজনীতা ও পরিমান জানা যায়।
ক্স সর্বোপরি মাটিতে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী পরিমানমত সুষম সার প্রয়োগ করা যায়।

মাটি পরীক্ষা ও সুষম সার 
সুষম সার বলতে এক বা একাধিক সারকে বুঝায় যা ফসলের পুষ্টি চাহিদা পূরনে মাটিতে প্রয়োগ করা হয় এবং কখনো কখনো গাছের পাতা স্প্রে করা হয়। অর্থাৎ ফসলের চাহিদামত যে সার পরিমাণমত প্রয়োগ করা হয় সেটাই সুষম সার। যেমন- কোন একটি ফসল উৎপাদনের জন্য জমিতে যদি তিনটি উপাদানের ঘাটতি থাকে এবং ঐ তিনটি উপাদান পরিমাণমত সরবরাহের জন্য যে সার প্রয়োগ করা হয় সেটাই সুষম সার। গাছ/ফসল মাটি থেকে ১৪টি পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে। ফসল উৎপাদনে পুষ্টি উপাদানসমূহের পরিমিত পরিমানে অবস্থানের নিশ্চয়তায় মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার প্রয়োগ করা হয়।

মাটি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সুষম সার প্রয়োগের সুফল
ক্স মাটি উর্বর এবং উৎপাদনক্ষম হয়।
ক্স মাটি থেকে সারের অপচয় কম হয়।
ক্স ফসলের উৎপাদন খরচ কমে যায়।
ক্স মাটিতে উপকারী অণুজীবের কার্যাবলি বাড়ে।
ক্স মাটিতে পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্যতা বজায় থাকে।
ক্স ফসল উত্তোলন পরর্বতীতে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
ক্স সর্বোপরি ফসলের ফলন, উৎপাদন ও গুণগতমান বাড়ে।

মাটিতে অনুমানভিত্তিক/মাত্রাতিরিক্ত সার প্রয়োগের অপকারিতা
মাটিতে অনুমানভিত্তিক/মাত্রতিরিক্ত সার প্রয়োগ করা হলে-
ক্স মাটির উর্বরতা এবং উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট হয়।
ক্স সারের অপচয় বেশি হয়।
ক্স ফসলের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
ক্স মাটিতে উপকারী অণুজীবের কার্যাবলি কমে যায়।
ক্স মাটিতে পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্যতাহীনতা দেখা যায়।
ক্স মাটিতে পুষ্টি উপাদানের বিষাক্ততা দেখা দিতে পারে।
ক্স মাটি দূষণ হয় বা হতে পারে।
ক্স ফসলের ফলন ও গুণগতমান কমে যায় বা যেতে পারে।

জমির মাটি পরীক্ষা করাতে হলে-
ক্স সঠিক পদ্ধতিতে মাটি সংগ্রহ করতে হবে।
ক্স সংগৃহীত মাটি এসআরডিআই এর আঞ্চলিক গবেষণাগারে পাঠাতে হবে।

ক্স জমিতে সার প্রয়োগের পূর্বে মাটি পরীক্ষা করে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে।
ক্স মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমানে জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে।
ক্স সঠিক সময় ও পদ্ধতিতে পরিমাণমত সার জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
ক্স সার প্রয়োগের পর বা প্রয়োজন অনুসারে পানি সেচ দিতে হবে।
ক্স প্রয়োজনে সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
ক্স মাটির অম্লত্ব কমানোর জন্য পরিমাণমত ডলোচুন(ডলোমাইট লাইম)/কৃষিচুন প্রয়োগ করতে হবে।
ক্স সুপারিশকৃত সারের অতিরিক্ত হারে সার প্রয়োগ করা যাবে না।
ক্স সারের গুনগতমান নিশ্চিত হয়ে বা নির্বাচিত সার বিশ্বস্ত সার ডিলার থেকে ক্রয় করতে হবে।
ক্স জমিতে জৈব সার প্রয়োগ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে।
ক্স বৃষ্টির পর জমিতে চটলা হলে মাটি আলগা করে বায়ু চলাচলের পথ সুগম করে দিতে হবে।
ক্স জমিতে আগাছা থাকলে তা অপসারন করে সার প্রয়োগ করতে হবে।
ক্স জৈব সার প্রয়োগ করলে পুষ্টি উপাদান বিবেচনা করে রাসায়নিক সার কম প্রয়োগ করতে হবে।
ক্স ডাল ফসলে জীবাণু সার প্রয়োগ করলে ইউরিয়া সার প্রয়োগের প্রয়োজন নাই।
ক্স মাটির অম্লত্ব কমাতে হলে ডলোমাইট লাইম/ডলোচুন প্রযোগ করতে হবে।
ক্স ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
ক্স মাটিতে রস সংরক্ষণের জন্য সম্ভব হলে জৈব জাবড়া প্রয়োগ করতে হবে।
ক্স শস্য পর্যায়ে ডাল জাতীয় ফসলের চাষ অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
ক্স সম্ভব হলে বছরে একবার সবুজ সার ফসলের চাষ করতে হবে।
ক্স ফসল বিন্যাসভিত্তিক সার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে

কৃষির আরো খবর জানতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিনঃকৃষিসংবাদ.কম

আরও পড়ুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৬-২০১৭. কৃষিসংবাদ.কম
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত)