<link rel="stylesheet" href="//fonts.googleapis.com/css?family=Open+Sans%3A400%2C300">নতুন আশার সঞ্চয় করেছে ভিয়েতনামের ওপি নারিকেল

এই পাতাটি প্রিন্ট করুন এই পাতাটি প্রিন্ট করুন

সম্ভাবনাময় ভিয়েতনামের ওপি নারিকেল


মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
ভিয়েতনামের ওপি নারিকেল :দেশে বছরে প্রায় ৩৫ কোটি নারিকেলের চাহিদা। উৎপাদিত হয় মাত্র ১০ কোটি পিস। এই প্রেক্ষাপটে নতুন আশার সঞ্চয় করেছে ভিয়েতনামের ওপি নারিকেল। কম সময়ে বেশি উৎপাদন আর প্রচুর লাভজনক এই নারিকেল চাষ। প্রচলিত জাতের চেয়ে দ্বিগুনেরও বেশি লাভ।
ভিয়েতনামী নারিকেল গাছ একদিকে উচ্চ ফলনশীল অন্যদিকে মাকড়শা প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। মাকড়শায় নারিকেল গাছের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। প্রচলিত নারিকেল গাছ ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মাকড়শায় আক্রান্ত হয়।
ইতিমধ্যে বরিশাল,পটুয়াখালী,পিরোজপুর,বাগেরহাট,দিনাজপুর,কুস্টিয়ায়,মেহেরপুর,সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহ, নাটোর, গাজীপুরে ভিয়েতনামী নারিকেল গাছ লাগানো হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় নারিকেল গাছগুলো দেখলে মনে হয়, পাহাড় তার পায়ে যেন নুপুর পরে আছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নারিকেল চাষের ওপর প্রশিক্ষন,ভাতা ও বিনামূল্যে চারা দেয়া হয়েছে। নারিকেলের উন্নয়নে কাজ করছে এশিয়ান প্যাসেফিক কোকোনাট কমিউনিটি। যার প্রধান কার্যালয় ইন্দোনেশিয়ায়। সংস্থাটি বাংলাদেশ সহ ১৮টি দেশ নিয়ে কাজ করছে। এই সংস্থার এক জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৪০ কোটি নারিকেল গাছ লাগানো সম্ভব।


সরকার ইতিমধ্যে পাঁচ লাখের বেশি ভিয়েতনামী নারিকেল গাছের চারা আমদানী করেছে বলে জানা যায়। ভিয়েতনামে কোটি পরিবারের আয়ের উৎস এই নারিকেল গাছ। এই নারিকেলের পাতা,ফুল,ফল,শেকড় সবই শিল্পের কাঁচামালে হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কোন কিছুই ফেলনা নয়। খাটো বিধায় ঝড় বাদলে ভেঙ্গে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম। সর্বোচ্চ উচ্চতা পাঁচ ফুটের মতো হবার কারণে রোগ বালাই দেখা দিলে ব্যবস্থা নেয়া সহজ হয়। যা প্রচলিত শ্রীলংকান বা ভারতীয় জাতের নারিকেল গাছে সম্ভব নয়। এছাড়া উচ্চতা হবার কারণে নারিকেল পাড়তে সমস্যা হয়। গাছ থেকে পড়ে মানুষ হতাহত হয়। যা ভিয়েতনামের ওপি নারিকেলে বেলায় হবার কোনই সম্ভাবনা নেই।


দুটি জাতের ভিয়েতনামের নারিকেল আমাদের দেশে এসেছে। সিয়াম গ্রিন কোকোনাট, এই জাতটি মূলত ডাবের জন্য। প্রায় ৩০০ গ্রামের মত পানি হয় একটি ডাবে। ওজন হয় এক থেকে দেড় কেজি। এই ডাবের পানি খুব মিষ্টি এবং সুস্বাদু বলে জানা যায়। ভিয়েতনামে ডাব পেরে সরাসরি মেশিনে কেটে ক্যানের আকৃতি করে কার্টনে ভরে বিদেশে রফতানি করা হয়। সিয়াম গ্রিন নামের ডাবটি সবুজ রঙের হয়। আর সিয়াম ব্লু হালকা গোলাটি রঙের হয়। যদিও এটি নাম সিয়াম ব্লু। তবে আসলে ব্লু নয়। সিয়াম ব্লু কোকোনাট,এটি সাইজে একটু বড়। ওপি নারিকেল গাছে খুব কম জায়গা লাগে। পরিচর্যা ও কম। ফলন অনেক বেশি। ফলন খুব দ্্রত হয় জানালেন ঝালকাঠীর মাহফুজুর রহমান। তিনি তিন একর জায়গায় নারিকেল বাগান করেছেন। তিনি জানান, ভিয়েতনামের নারিকেলের বহুবিধ সুবিধা। যেমন যে কোন মাটিতে এই গাছ হয়। এই গাছের মধ্যবর্তী দুরত্বে শাক সবজির আবাদ করা যায়। কোন অসুবিধা নেই। ফলমুলের গাছ অনায়াসে লাগানো যায়। তিনি আরো জানান, এই নারিকেল গাছ লবনাক্ততা বেশি সহ্য করতে পারে। ফলে উপকুলীয় সমুদ্্রবর্তী এলাকায় এই গাছ অর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভুমিকা রাখতে পারে।
সপ্তাহে মাহফুজুরের আয় দশ হাজার টাকা। যদিও তার সব গাছে ফলন এখনো আসেনি। পাচজন শ্রমিক তার খামারে কাজ করছে। তিনি জানান ভিয়েতনামী খাটো জাতের নারিকেল গাছের দ্বারা বছরে ২৫/৩০ লাখ টাকা উপার্জন সম্ভব। বাংলাদেশে থাই পেয়ারার প্রবক্তা কৃষিবিদ কামরুজ্জামান। তিনি ভিয়েতনাম গিয়ে দুটি উচ্চ ফলনশীল নারিকেলের জাত সনাক্ত করেন। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রফেসর পরিমল কান্তি বলেন, প্রতি বিঘাতে এই জাতের ৪৫টি গাছ লাগানো যায়। প্রতিটি গাছের মধ্যবর্তী দুরত্ব ৬ মিটার। এই মধ্যবর্তী দুরত্বে পেয়ারা, আদা, পেয়াজ, রসুন ও সবজির আবাদ করে অর্থনীতিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। একটি গাছ থেকে বছরে প্রায় ৫ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। যেখানে প্রচলিত নারিকেল গাছ থেকে বছরে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা আয় করা যায়। সফল চাষী হাসমত জানান, ভালো ফলন পেতে হলে গর্ত প্রস্তুত করে নিতে হয়। প্রতি গর্তে ৪০/৫০ কেজি গোবর বা জৈব সার, ২ কেজি হাড় বা শুকটির গুড়া,আধা কেজি নিমের খৈল,৩০০ গ্রাম টিএসপি,৩৫০ গ্রাম এমওপি, ১০০ গ্রাম জিংক সালফেট, ২০০ গ্রাম বোরন, ৫০ গ্রাম ফুরডান, ১০ গ্রাম ছত্রাক নাশক মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। এরপর ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর মাদার চারা রোপন করতে হয়। ১০০ কেজি গোবর সার, আধা কেজি ইউরিয়া দিলে আরো ভালো হয় বলে তিনি জানন। ভালো ফলনের জন্য দুই/তিন মাস পরপর গোবর সার বা জৈব সার দিতে হয়। কৃষিবিদ ইফফাত আরা ইসলাম জানান, এই জাতের গাছ রোদ এবং পানি পছন্দ করে। তাই ভালো ফলন পেতে এই দুটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদফতর সুত্রে জানা যায়, সরকার এখন অবধি কোন বেসরকারী নার্সারীকে ভিয়েতনামী ওপি নারিকেলের চারা আমাদনী করতে অনুমতি বা আইপি দেয়নি।
হর্টিকালচার সেন্টারে প্রতি পিস চারা ৫০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলন দ্রুত এবং বেশি হবার কারণে আমাদের দেশের চাষীরা ভিয়েতনামী নারিকেলকে ম্যাজিক নারকেল বলে থাাকে। প্রতি বছর আমাদের দেশে নারিকেলের চাহিদা ৩০০ মিলিয়ন হলেও উৎপাদন হয় মাত্র ১০০ মিলিয়ন পিস। অন্য এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে খাবার এবং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে প্রতি বছর ৩৫ কোটি নারিকেলের চাহিদা আছে। অথচ উৎপাদিত হয় মাত্র ১০ কোটি নারিকেল।
বাকী নারিকেল আমদানী করতে হয়। কৃষি সম্প্্রসারণ অধিদফতরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশের ৪ হাজার ৮৭ একর জমিতে ৬২ লাখ নারিকেল গাছ আছে; যা চাহিদার তুলনায় খুব কম।
প্রচলিত বিভিন্ন জাতের নারিকেল গাছ থেকে ফলন পেতে সময় লেগে যায় ৬/৭ বছর। সেখানে ভিয়েতনামের ওপি নারিকেল গাছে ফলন পাওয়া যায় আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে। বরিশাল হর্টিকালচার নার্সারীতে ২২ মাসে ফলন এসেছে।
প্রথম কিস্তিতে ২০০ থেকে ২৫০টি নারিকেল পাওয়া যায়। প্রচলিত জাতে ৪০ থেকে ৫০টির বেশি পাওয়া সম্ভব নয়। এই জাতের ডাব যত কাটা হবে,তত বেশি ফুল ও ফল আসবে বলে জানান কৃষিবিদ ইফফাত আরা ইসলাম। একটি নারিকেল গাছে ৩০টির উপড়ে ডাল থাকে। প্রতি মাসে একটি করে ডাল বের হয়ে হলে গাছটি সুস্থ আছে মনে করা হয়।
ভিয়েতনামের ওপি নারিকেল আমাদের দেশের পরিবেশের কোন ক্ষতি করবে না। পরীক্ষা নিরীক্ষা করেই আনা হয়েছে বলে জানান পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প পরিচারক কৃষিবিদ মো. নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে আনা এসব চারা পরিবেশের কোন ক্ষতি করবেনা। সরকারী হর্টিকালচার সেন্টারে ওপি নারিকেলের চারা পাওয়া যায়। উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে তারা চারা সংগ্রহ করে দেয়া হয় বলে জানা যায়। পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ মেহেদী হাসান জানান, ভিয়েতনাম থেকে ১০ লাখ মাতৃচারা আনার প্রকল্প রয়েছে সরকারের। যখন ১০ লাখ মাতৃচারা হয়ে যাবে তখন এ গাছের ফল থেকে চারা উৎপাদন করে আমরা নিজেরাই চারা সরবারহ করতে পারবো। ইতিমধ্যে দক্ষিনাঞ্চলে ওপি নারিকেল সাড়া ফেলেছে।
নি:সন্দেহে নারিকেল একটি অর্থকারী ফসল। অদুর ভবিষ্যতে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে নারিকেল রফতানি করা সম্ভব বলে মনে করেন এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৭-২০১৮. কৃষিসংবাদ.কম
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত)