এই পাতাটি প্রিন্ট করুন এই পাতাটি প্রিন্ট করুন

ফলের জগতে নাবি জাতের সম্ভাবনাময় নতুন জাতের আম গৌরমতি

Share

নতুন জাতের আম গৌরমতি

মো. মোশারফ হোসেন, শেরপুর প্রতিনিধি :

নতুন জাতের আম গৌরমতি

বাংলাদেশে সাধারণত জুলাই মাসের মধ্যে আমের রাজত্ব শেষ হয়ে যায়, তবে হিমসাগর ও আশ্বিনা জাতের কিছু আম আগষ্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া যায়। কিন্তু ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা (উইং)-এর পরিচালক আবু হানিফ মিয়া পরিদর্শনে আসলে শিবগঞ্জ উপজেলার সোনামজিদ এলাকার শিয়ালমারা গ্রামের এক আম বাগানে নতুন জাতের এক আমের সন্ধান মিলে, যা নাকি সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে পাওয়া যায়। এই আম সুস্বাদু, কড়া মিষ্টি ও খুব পুষ্টিকর এবং সবার শেষে পাকে বলে দামটাও বেশ ভালো পাওয়া যায়। নতুন এই নাবি জাতের আমের নাম দেওয়া হয়েছে গৌরমতি।

বিজ্ঞানীদের ধারনা আশ্বিনা ও ল্যাংড়া এই দুই জাতের আমের মুকুলে প্রাকৃতিক পরাগায়নের ফলে নতুন এই জাতটির উৎপত্তি হয়েছে। এর মিষ্টতা (টিএসএস) ২১.৭৫ থেকে ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশের অন্যান্য সুস্বাদু আমের ভক্ষণযোগ্য অংশ যেখানে ৮০ থেকে ৮২ শতাংশ, সেখানে গৌরমতি আমের ভক্ষণযোগ্য অংশ প্রায় ৯৩ শতাংশ। কেউ কেউ বলেন গৌরমতি আম পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মিষ্টি ও সেরা আম। এইসব বিবেচনায় অনেকেই এই আমের বাগান করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। আমাদের দেশের প্রতিটি এলাকায় এই গৌরমতি জাতের আম চাষের বিপুল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

তৎকালীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (উদ্যান) মঞ্জুরুল হক এই আমের গৌরমতি নামকরন করেন। প্রাচীন জনপদ ‘গৌড়’ ও রতœ মূল্যের সাথে তুলনায় ‘মতি’ এই দুইয়ের সমন্বয়ে ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে নতুন জাতের এই আমের নাম দেওয়া হয় গৌরমতি। তার পর থেকে এ জাতের আমের চারা সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে কৃষি সম্প্রসাণ অধিদপ্তর পরিকল্পনা গ্রহন করে। ওই বছর থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীন সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান প্রকল্পের কর্মসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করে সারাদেশে এক লক্ষ চারা বিতরণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়।

দেশের ২১ টি হর্ট্রিকালচারের মাধ্যমে দেশ ব্যাপী এই আমের চারা ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তার অংশ হিসেবে ২০১৪ সালে শেরপুর জেলার নকলা উপজেলাধীন চন্দ্রকোণা ইউনিয়নের রামপুর এলাকার রফিকুল ইসলাম রফিকসহ দুই জনের মাঝে একটি করে মাত্র দুইটি গৌরমতি আমের কলম চারা বিতরণ করা হয়। ২০১৬ সাল হতে ওইসব গাছে ফলন আসা শুরু হয়। রফিক জানান, তার অন্যান্য আমের চেয়ে এই আমের ফলন বেশি, ঝড় বৃষ্টিতে ঝড়ে পড়েনা, অধিক মিষ্টি, সবার শেষে পাকে, তাই দাম অনেক বেশি পাওয়া যায়। গৌরমতি খুব ভালো জাতের আম। তাই আগামীতে এই জাতের আরও চারা লাগাবেন বলে তিনি জানান। তার ওই আমের গাছের ফলন দেখে এলাকার অনেকেই গৌরমতি আমের প্রতি ঝুঁকছেন।

এবিষয়ে নকলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল ওয়াদুদ জানান, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে গৌরমতি আমের চারা সংগ্রহ করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হুমায়ূন কবীর জানান, হর্টিকালচারের মাধ্যমে দেশ ব্যাপী গৌরমতি আম ছড়িয়ে দিতে হর্টিকালচার সেন্টার ও কৃষি অফিস নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু গৌরমতি আমের চারার দাম বেশি হওয়ায় এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় কৃষকরা সহজেই এই জাতের আমের বাগান করতে পারছেন না। যদি চারার উৎপাদন বাড়িয়ে দাম কমানো যায়, তাহলে গৌরমতি জাতের আমের বাগান করে অনেক কৃষক সহজেই লাভবান ও স্বাবলম্বী হতে পারেন।

তথ্যমতে, দেশ ব্যাপী গৌরমতি আম বিস্তারের লক্ষ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক (ডিডি) ড. মো. সাইফুর রহমানের তত্ববধানে এ বছর দশ সহস্রাধিক গৌরমতি জাতের আমের কলম কাটা চারা উৎপাদন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ওই সব চারা আনুষ্ঠানিক ভাবে বিক্রি করা শুরু হয়েছে। ড. সাইফুর রহমান জানান, তার তত্বাবধানে দেশের ২১টি হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে গৌরমতি আমের জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে কাজ চলছে।

তিনি আরও জানান, কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টারে উৎপাদিত গৌরমতি আমের চারার কদর দিন দিন বাড়েছে। ওই হর্টিকালচারে বীজ থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন গাছ ও কলমের মাধ্যমে উৎপাদিত বিভিন্ন চারার মধ্যে গৌরমতি আমের কলম করা চারার চাহিদা গত বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে।

এ বিষয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত নার্সারি মালিক ও ফল বাগানের মালিকরা জানান, অন্যান্য আবাদের তুলনায় ফলের বাগানে অধিক লাভ পাওয়ায় আধুনিক পদ্ধতিতে মডেল ফল বাগানের দিকে তারা ঝুঁকছেন। তাদের দেখাদেখি এলাকার অনেকেই অন্যান্য আবাদ ছেড়ে বিভিন্ন ফল বাগানে আগ্রহী হয়েছেন। এমন ফল বাগানের পরিমাণ ও কৃষকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলে তারা জানান। আগামীতে হর্টিকালচার সেন্টারে উৎপাদিত বিভিন্ন ফল চারার চাহিদা দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারনা করছেন নার্সারী ব্যবসায়ী ও কৃষকরা। এতে করে দেশের মানুষের ফলের পুষ্টি চাহিদা অনেকটাই পূরন হবে, পাশাপাশি বিদেশ থেকে ফল আমদানীর পরিমান কমবে। ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত বিদেশী ফল খাওয়া কমিয়ে মারাত্মক ক্ষতির হাত থেকে মুক্তি পাবে লাখো বাঙ্গালী এমনটাই আশা করছেন সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ, কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি গবেষক ও পুষ্টি বিজ্ঞানীগন।

 

আরও পড়ুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৭-২০১৮. কৃষিসংবাদ.কম
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত)