এই পাতাটি প্রিন্ট করুন এই পাতাটি প্রিন্ট করুন

‘বিনা’র প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে

Share

ডিপ্লোমা কৃষিবিদ জিয়াউল হক:

 

বাংলাদেশ পরমানু কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট যার সংক্ষিপ্ত নাম ‘বিনা’। বিগত অর্ধশতাব্দি কাল থেকে এ দেশে কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিবেশ বান্ধব, হুমকী মোকাবেল উপযোগী ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে এ সংস্থাটি। ১৯৬১ সালে ঢাকায় আণবিক শক্তি কমিশনের ছোট্ট একটি ল্যাবরেটরিতে ক্ষুদ্র পরিসরে এর কাজ শুরু হয়। স্বাধীনতার পর বাংঙ্গালী জাতীর মহাননেতা, স্বাধীনতার স্বপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পরমানু কৃষি ইনস্টিটিউট বা ‘ইনা’। এ প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর স্থাপন করা হয় এশিয়া মহাদেশের বিখ্যাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নামে খ্যাত ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। বর্তমানে সেখানে ৩৩ একর জায়গা জুড়ে এর অবকাঠামো ও আনুসাঙ্গিক সুবিধাবলি গড়ে উঠেছে।

সদর দপ্তর ছাড়াও বাংলাদেশ পরমানু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘বিনা’র আওতায় সারাদেশে আরো ১৩টি উপকেন্দ্র রয়েছে। এসব উপকেন্দ্রের মাধ্যমে বিনা মাঠ পর্যায়ে তাদের গবেষনা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উপকেন্দ্রগুলো হলো রংপুর, ঈশ্বরদী, মাগুরা, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা, জামালপুর, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, খাগড়াছড়ি, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, গোপালগঞ্জ, নোয়াখালী ও চাপাইনবাবগঞ্জে অবস্থিত। এসকল উপকেন্দ্রগুলোতে উন্নত জাতের ফসল জাত উদ্ভাবন করে পরীক্ষা নিরিক্ষার পাশাপাশি, কৃষকের নিকট হতে তাদের সমস্যা শুনে সমাধানের চেষ্ঠা করা হয়।

বিনা বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধিনে একটি আধাসরকারী স্বায়িত্বশাশিত কৃষি গবেষনা প্রতিষ্ঠান। পরমানু ও উন্নত প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার দ্বারা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিসহ পরিবেশ বান্ধব ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনই এর মুল কাজ। এযাবৎ বাংলাদেশ পরমানু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘বিনা’ গবেষণা চালিয়ে ১২টি বিভিন্ন ফসলের উন্নত ও উচ্চফলনশীল ৯১টি জাতের উদ্ভাবন করেছে। যার মধ্যে ধান ১৩টি, সরিষা ১০টি, পাট ৩টি, চিনাবাদাম ৬টি, মুগ ৮টি, ছোলা ৮টি, মসুর ৭টি, খেসারি ১টি, টমেটো ১০টি, মাষ ১টি, তিল ৩টি ও সয়াবিনের ৪টি ফসলের উন্নত জাত সমূহ উল্লেখ যোগ্য। তাছাড়া বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উচ্চ ফলনশীল জাত, নাইট্রোজেনের বিকল্প হিসেবে জীবানু সার উন্নত চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় কৃষি গবেষনা সিস্টেমের আওতাভূক্ত প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পরমানু গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘বিনা’ তার নিজের অন্যন্য অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। বিনার একদল অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী মিলে দেশের উন্নয়নে কাজ করছেন রাতদিন। যারা বিভিন্ন ফসলের পরমানু সংগ্রহ করে গবেষনার মাধ্যমে উন্নত জাতের বীজ তৈরি করে যার মাধ্যমে নতুন করে উন্নত ফসল আবাদ এবং আবাদের ফলন বৃদ্ধিতে কাজ করে থাকে। বিজ্ঞানীরা পরমানু ও জৈবপ্রজনন কৌশল ব্যবহার করে শুধু লাভজনকই নয় বরং পরিবেশ বান্ধব ও প্রকৃতি হুমকি মোকাবেলার উপযোগী ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করাই তাদের লক্ষ। আর বাংলাদেশের অপুষ্টি নিরসনে এবং খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে।
বিনা’ উদ্ভাবিত কয়েকটি উন্নত জাতের উচ্চ ফলনশীল ধান ও সরিষার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিম্মে উপস্থাপন করা হলো।
১. বিনাধান ৭: বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত আগাম আমন ধান জাত বিনাধান-৭, এটি ২০০৭ সালে সরকারী অনুমোদন লাভ করে। যার সাধারণ জীবনকাল ১১০-১২০দিন, গাছ খাটো, হেলে পড়ে না, চাল সরু ও লম্বা। এ জাতের বিশেষত্ব হলো এটি বাদামী গাছ ফড়িং প্রতিরোধী। এর হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৪.৮ টন।

২. বিনাধান ৮ : লবণাক্ততা সহিষ্ণু উচ্চ ফলনশীল বোর ধানজাতটি অনুমোদন পায় ২০১০ সালে। এটি ৮-১০ ডিএস/এম মাত্রায় লবণাক্ততা সহনশীল। এ জাতের ধান সামুদ্রিক এলাকায় ব্যাপক সারা ফেলেছে। এর সাভাবিক জীবনকাল ১৩০-১৩৫দিন। পাতা পোড়া, বাদামি ঘাস ফড়িং, কান্ড পচা ও খোল পচা রোগের প্রতিরোধী জাত।

৩. বিনা সরিষা-৪: আগাম পরিপক্ক, উচ্চ ফলনশীল ও অল্টারনেরিয়া ব্লাইট রোগ সহনশীল এ জাতটি ১৯৯৭ সালে অনুমোদন পায় এটি ভালো একটি সরিষার জাত। এর জীবন কাল ৮০-৮৫দিন। এর বীজে তৈলের পরিমাণ ৪৪% আর ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ কম ২৭%। তাই এ জাতের সরিষা আবাদে কৃষক লাভবান হয়।

বাংলাদেশ পরমানু কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট ‘বিনা’ সহ বাংলাদেশের কৃষি গবেষনা প্রতিষ্ঠানগুলো নানান ফসলের উন্নত জাত আবিস্কার করার ফলে বাংলাদেশ বর্তমানে কৃষিতে পৃথিবীর চতুর্থ স্থানে রয়েছে। এদেশের তিনবারের সৎ, স্বচ্ছ ও সফল কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর আন্তরিকতায় সরকারের ১ নম্বর সফলতার দপ্তর কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বিনার পরিচালক ড. শমশের আলী বলেন, কৃষি খাতকে উন্নত করার জন্য আমরা সমস্ত বৈজ্ঞানিকদের নিয়ে মাঠে ময়দানে কৃষকের আদর্শ মানের ফসল সম্পর্কে হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। বিনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো জনপ্রিয় এবং সুস্বাদু স্থানীয় জাতের উন্নয়ন, প্রতিকুল পরিবেশে উপযোগী জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, শস্য নিবিড়তার মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়ন, ফসলের পুষ্টি সমৃদ্ধ জাত উন্নয়ন, গুরুত্বপূর্ণ জিন পৃথকীকরণ ও জেনিটেক্যালি মফিাইড ফসল উদ্ভাবনসহ উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যাতে বাংলাদেশের কৃষিতে আরো উন্নয়ন সম্ভব হয়।

লেখক:
ডিপ্লোমা কৃষিবিদ জিয়াউল হক,
কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, শেরপুর।

আরও পড়ুনঃ

Comments are closed.

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৭-২০১৮. কৃষিসংবাদ.কম
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত)