এই পাতাটি প্রিন্ট করুন এই পাতাটি প্রিন্ট করুন

মহাশোল মাছের পোনা উৎপাদন ও লাভজনক চাষ ব্যবস্থাপনা ( ১মপর্ব)

Share

মহাশোল মাছের পোনা উৎপাদন

মো. মশিউর রহমান ও ড. এএইচএম কোহিনুর

মহাশোল মাছের পোনা উৎপাদন ঃউপমহাদেশে “স্পোর্ট ফিশ” হিসেবে সমাদৃত মহাশোল মাছ বাংলাদেশে বিদ্যমান বিপন্ন প্রজাতির কার্প জাতীয় মাছের মধ্যে অন্যতম। কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের (যেমন- ময়মনসিংহ, সিলেট, দিনাজপুর এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম) খরস্রোতা নদী, ঝর্ণা, লেক এবং পার্শ্ববর্তী খালে-বিলে ২টি প্রজাতি মহাশোলের (Tor tor Ges T. putitora) প্রাচুর্যতা ছিল। বিভিন্ন মনুষ্যসৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক কারণে এদেশে মহাশোলসহ বহু মূল্যবান মৎস্য প্রজাতির বিচরণ এবং প্রজননক্ষেত্র ক্রমান্বয়ে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মহাশোলের প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়ে মাছটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। মাছটির জীববৈচিত্র হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে কার্প জাতীয় অন্যান্য মাছের তুলনায় এর অত্যন্ত কম ডিম ধারণ ক্ষমতাকেও (৬,০০০-১১,০০০/কেজি) চিহ্নিত করা হয়। বর্ণিত কারণসমূহ বিবেচনায় রেখে বিলুপ্তপ্রায় মাছের জীববৈচিত্র রক্ষায় বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে এর জীববৈচিত্র সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ইনস্টিটিউটে প্রজননের মাধ্যমে উৎপাদিত পোনা বিভিন্ন জলজ পরিবেশে অবমুক্তি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

মহাশোল মাছের বৈশিষ্ট্য
ক্স ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল এবং পাকিস্তানে স্পোর্ট ফিশ হিসেবে পরিচিত
ক্স পাহাড়ি খরস্রোতা নদী, ঝর্ণা এবং লেক এদের মূল আবাসস্থল
ক্স শীতকালে অপেক্ষাকৃত নিম্ম তাপমাত্রায় এ মাছটি প্রজনন করে থাকে
ক্স কার্প প্রজাতির অন্যান্য মাছের সাথে এর মিশ্রচাষ করা যায়
ক্স রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি বলে এ মাছটি সাধারণত রোগাক্রান্ত হয় না।

নিয়ন্ত্রিত প্রজনন ও পোনা উৎপাদন কৌশল

ব্রুড মাছ ব্যবস্থাপনা কৌশল
ক্স সাধারণত নভেম্বর-জানুয়ারি পর্যন্ত মহাশোল মাছের সর্বানুকূল প্রজননকাল, যখন পুকুরের পানির তাপমাত্রা ১৭-২২০ সে. বজায় থাকে।
ক্স সারাবছর পানি থাকে এমন ৪-৫ ফুট গভীর পুকুর প্রজননক্ষম মাছের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
ক্স প্রজনন মৌসুমের ১-২ মাস পূর্বে স্ত্রী ও পুরুষ মাছ আলাদা পুকুরে মজুদ করতে হয়।
ক্স ব্রুড মহাশোল মাছ হেক্টর প্রতি ১,০০০-১,৫০০ টি মজুদ করলে সবচেয়ে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়।
ক্স মাছের পরিপক্কতা বৃদ্ধি করার জন্য প্রতিদিন পুকুরে ২-৩ ঘন্টা পরিস্কার পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা থাকলে ভাল হয়।
ক্স মজুদকৃত ব্রুড মাছকে ২৫% প্রোটিন সমৃদ্ধ সম্পুরক খাদ্য দেহ ওজনের ৪-৫% হারে প্রতিদিন সরবরাহ করতে হবে। নি¤œলিখিত সারণি অনুসরণ করে বা ভাসমান পিলেট খাবার সম্পূরক খাবার হিসেবে প্রদান করা যেতে পারে।
ক্স পুকুরের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য হেক্টর প্রতি ২৫ কেজি ইউরিয়া ও ৪০ কেজি টিএসপি ১৫ দিন পর পর পর্যায়ক্রমে প্রয়োগ করতে হয়।

প্রজননক্ষম মাছ নির্বাচন, নিয়ন্ত্রিত প্রজনন ও পোনা প্রতিপালন কৌশল
ক্স প্রজনন মৌসুমে পরিপক্ক স্ত্রী মাছের ডিম্বাশয় ডিমে ভর্তি থাকে বলে পেট ফোলা ও স্ফীত হয় এবং বক্ষ পাখনা মসৃন থাকে।
ক্স পুরুষ মাছের বক্ষ পাখনা খসখসে এবং জননাঙ্গেঁর সামান্য উপরে চাপ দিলে সাদা মিল্ট বের হয়ে আসে।
ক্স এ মাছের প্রজননের জন্য কোন প্রকার হরমোন প্রয়োগ করতে হয় না। শুধুমাত্র চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পরিপক্ক স্ত্রী ও পুরুষ মাছ থেকে ডিম ও মিল্ট সংগ্রহ করতে হয়।
ক্স সংগৃহীত ডিমের সাথে ১-২ ফোটা মিল্ট মিশিয়ে ০.৮% সোডিয়াম ক্লোরাইড এর ফিজিওলজিক্যাল দ্রবণ দিয়ে ডিম নিষিক্ত করা হয়।
ক্স নিষিক্ত ডিমগুলোকে কয়েকবার ডিপটিউবওয়েলের পানি দিয়ে ধূয়ে ডিমের আঠালুভাব দুর করে হ্যাচিং জারে স্থাপন করা হয়।
ক্স সাধারণত ২১-২৩০ সে. পানির তাপমাত্রায় ৭২-৮০ ঘন্টা পর ডিম ফুটে লার্ভি বের হয়ে আসে। মহাশোল মাছের ডিমের পরিস্ফুটনের হার ৭০-৭৫% হয়ে থাকে।
ক্স লার্ভির বয়স পাঁচ দিন হলে এদের খাবার হিসেবে হাঁস-মুরগীর ডিমের সিদ্ধ কুসুম সরবরাহ করা হয় এবং এ সময়ই রেণুপোনা আঁতুড় পুকুরে ছাড়ার উপযোগী হয়। এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত রেণুপোনার বাঁচার হার ৮০-৯৫% হয়ে থাকে।

নার্সারি পুকুরে পোনা লালন কৌশল
মহাশোলের নার্সারি ব্যবস্থাপনার সময় নি¤œলিখিত বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবেঃ

ক্স নার্সারি পুকুরের আয়তন ১০-২০ শতাংশ এবং গভীরতা ০.৮০-১.০ মিটার হতে হবে
ক্স পুকুরে পানির ইনলেট ও আউটলেট থাকা নার্সারি পুকুরের পানির গুণাগুণ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ
ক্স সাধারণ কার্প জাতীয় মাছের নার্সারি ব্যবস্থাপনার মত মহাশোলের নার্সারি পুকুর থেকে বিভিন্ন ধরণের জলজ আগাছা যেমন- কচুরিপানা, টোপা পানা, ক্ষুদি পানা এবং তন্তু জাতীয় বিভিন্ন শেওলা দমন করতে হবে
ক্স অতঃপর পুকুর শুকিয়ে বা রোটেনন (১ পিপিএম) প্রয়োগ করে রাক্ষুসে ও অন্যান্য অবাঞ্চিত মাছ দমন করতে হবে
ক্স শুষ্ক পুকুরের তলদেশে বা নির্ধারিত গভীরতায় পানিতে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে
ক্স প্রাকৃতিক খাবার উৎপাদনের জন্য চুন প্রয়োগের ১-২ দিন পর প্রতি শতাংশে ১০ কেজি হারে গোবর প্রয়োগ করতে হবে
ক্স গোবর প্রয়োগের ৫-৬ দিন পর পুকুরের পানি হালকা বাদামী রং ধারণ করলে পুকুর পোনা মজুদের উপযোগী হয়
ক্স পোনা মজুদের ২৪ ঘন্টা পূর্বে প্রতি শতাংশে ১০ মিলি. হারে প্রয়োগ করে হাঁসপোকাসহ অন্যান্য অনিষ্টকারী পোকা বা বড় আকারের জ্যুাপ্লাংক্টন দমন করা যায়।
ক্স নার্সারি পুকুরে ৫ দিন বয়সের রেনুপোনা (১.১২-১.২৫ সেমি.) প্রতি শতাংশে ২,৪০০টি (৬০০,০০০ টি/হেক্টর) ছাড়তে হবে
ক্স নার্সারি পুকুরে পোনা মজুদের পর সম্পুরক খাবার হিসেবে ১ম সপ্তাহে নার্সারি ফিড এবং পরবর্তী ৬ সপ্তাহ স্টার্টার-১ ফিড পোনার দৈহিক ওজনের ৭-১০ ভাগ হারে প্রয়োগ করতে হবে
ক্স প্রতি সপ্তাহে একবার নমুনায়ন করে পোনার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে খাবারের পরিমাণ সমন্বয় করা আবশ্যক
ক্স এভাবে ২ মাস পোনা লালন পালনের পর পোনার আকার যখন ৬.০-৭.০ সেমি. হলে চাষের পুকুরে ছাড়ার উপযোগী হয়।

আহরণ ও উৎপাদন
ক্স নার্সারি পুকুরে ২ মাস লালনের পর পর্যায়ক্রমে জাল টেনে এবং পুকুর শুকিয়ে চারা পোনা আহরণ করা হয়।
ক্স এ ধরণের নার্সারি ব্যবস্থাপনায় হেক্টর প্রতি গড়ে ৫.০-৫.৫ লক্ষ আঙ্গুলী পোনা উৎপাদন করা যায়।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৭-২০১৮. কৃষিসংবাদ.কম
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত)