রাম্বুতান (Rambutan) ফল
কৃষিবিদ ড. বশির আহম্মেদ
রাম্বুতান (Rambutan) ফল ঃ রাম্বুতান আকর্ষণীয়, মুখরোচক ও রসালো ফল। এর শাঁস বা এরিল সাদা, স্বচ্ছ, অম্লীয় মিষ্টি গন্ধযুক্ত। ফলের গায়ে লাল ও নরম Spines থাকায় এটা দেখতে লিচু থেকে কিছুটা ব্যাতিক্রম। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতেই এ ফলের উৎপত্তিস্থল। তবে, দক্ষিণ চীন, ইন্দোচীন ও ফিলিপাইন পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। বাংলাদেশের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল যেখানে শীতের প্রকোপ তুলনামূলকভাবে কম সেখানে রাম্বুতান চাষ ব্যাপক উপযোগী। রাম্বুতান শর্করা ও ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ একটি ফল।
জাত
বারি’র একমাত্র অনুমোদিত জাতটি হচ্ছে বারি রাম্বুতান-১। গাছ বড় এবং অত্যাধিক ঝোপালো উচ্চ ফলনশীল জাত। ফাল্গুর-চৈত্র মাসে ফুল ধরে এবং চৈত্র+বৈশাখ মাসে ফল ধরে। ফল ডিম্বাকৃতির, আকারে বড় (প্রায় ৫০গ্রাম)। পাকা ফল আকর্ষণীয় লালচে খয়েরী রঙের। ব্রিক্সমান ১৯%, এ ফল শ্রাবণ মাসে Harvest করা হয়।
জলবায়ু ও মাটি
উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু পছন্দকারী ফলদ উদ্ভিদ। ২২-৩৫°সে. তাপমাত্রা এবং ২০০০-৩০০০ মিমি বৃষ্টিপাত সহ্য করতে পারে। এঁটেল দোয়াশ মাটি রাম্বুতান চাষের জন্য বেশ উপযোগী। সুনিষ্কাশিত জৈবপদার্থ সম্বলিত মাটি এ গাছের বৃদ্ধি ও বিকাশ ভালো হয়। রাম্বুতান সল্পমেয়াদী জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে।
বংশ বিস্তার
যৌন এবং অযৌন উভয় ভাবেই রাম্বুটানের বংশ বিস্তার হয়ে থাকলেও মাতৃ গুণাগুন বজায় রাখার জন্য অঙ্গজ উপায়ে বংশ বিস্তার উত্তম। বর্তমানে দেশে এ ফলের অঙ্গজ বংশবৃদ্ধির হার ক্ষীণ। বিএডিসি’র এগ্রো সার্ভিস কার্যক্রমের মাধ্যমে এগ্রো সার্ভিস প্রদর্শনী খামার দিনাজপুরে রাম্বুতানের মাতৃগাছ থেকে অঙ্গজ উপায়ে বংশ বিস্তারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, আশানুরুপ ফলাফল এখনও পাওয়া যায়নি। তবে কৃষি গবেষণা ইনিস্টিউটের তথ্যমতে, সংযুক্ত দাবা কলম পদ্ধতিতে সফলতার হার বেশি কিন্তু শ্রমসাধ্য।
জমি ও মাদা তৈরি
সুনিষ্কাশিত উঁচু মাঝারী উঁচু জমি রাম্বুতানের জন্য উপযুক্ত। আড়াআড়ি কয়েকটি চাষ ও মই জমি সমান করে নিতে হবে। জমি অবশ্যই আগাছা মুক্ত হতে হবে। উভয় দিকে ৮-১০ মিটার দূরত্বে ১x১x১ মিটার আকারের গর্ত করে উম্মুক্ত রেখে চারা রোপনের ১০-১৫ দিন পূর্বে ২৫-৩০কেজি পঁচা গোবর, ৫০০গ্রাম TSP, ৩০০ গ্রাম MoP, ২০০গ্রাম Gypsum ও ৫০গ্রাম Zinc Sulphate গর্তের মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করতে হবে।
চারা রোপণ
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি চারা রোপনের উপযুক্ত সময়।
সমতল ভুমিতে বর্গাকার বা হেক্সাগোনাল এবং পাহাড়ি জমিতে কন্টুর পদ্ধতিতে চারা রোপণ করতে হবে। চারাটি গর্তের মাঝখানে লাগিয়ে ভালভাবে মাটিতে বসিয়ে দিতে হবে এবং খুঁটি, বেড়ার ব্যবস্থাকরতে হবে। এরপর নিয়মিত সেচ দিতে হবে।
আন্তপরিচর্যা
ক) রাম্বুতান যেহেতু বহুবর্ষজীবী ফল গাছ তাই বিভিন্ন বয়সে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় বছরে ৩বার সুপারিশকৃত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। ১ম কিস্তি ভাদ্র মাসে, ২য় কিস্তি কার্তিক মাসে এবং ৩য় কিস্তি ফল আসার আগে বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে প্রয়োগ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ প্রদান করতে হবে।
খ) বর্ষার আগে এবং পরে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। শুকনো মৌসুমে ১০-১৫দিন পরপর সেচ দিতে হবে। ফলন্ত গাছে ফুল ফোটার পর্যায়ে একবার, ফল বোল্ড অবস্থায় একবার এবং এর ১৫ দিন পর আরো একবার মোট তিনবার সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। জলবদ্ধতার সৃষ্ট হলে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। ফুল ফোটার ৬-৮ সপ্তাহ আগে Slightly draught condition এ রাখতে পারলে আগাম ও অধিক ফুল ফোটে।
গ) প্রুনিং
রাম্বুতান গাছের লম্বা ও খাড়াভাবে বাড়ার প্রবনতা থাকায় প্রথম থেকেই প্রুনিং করতে হবে। ফল সংগ্রহের পর পর ফলের মুকুলগুলো গোড়া থেকে কেটে দিতে হবে। মৃত, রোগাক্রান্ত ও দুর্বল ডালপালা নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। কলমের চারার ক্ষেত্রে প্রথম ৩-৪ বছর মুকুল আসলে তা কেটে দিতে হবে।
ঘ) রোগ ও পোকামাকড় দমন
ফল ছিদ্রকারী পোকা, ছাতরা পোকা এবং পাউডারী মিলডিউ এবং ড্যাম্পিং অফ রোগ এ ফলদ বৃক্ষের জন্য ক্ষতিকর আপদ। এ সকল পোকামাকড় এবং রোগবালাই দমনের জন্য সুপারিশকৃত মাত্রায় বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে এবং নিকটস্থ কৃষি অফিসের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
ফল সংগ্রহ
ফল ও Spinelet এর রং লালচে খয়েরী বর্ণ ধারণ করার ১০-১২ দিনের মধ্যেই সংগ্রহ করা উত্তম। এ ফল অতিরিক্ত পাকিয়ে সংগ্রহ করলে এরিল শুকিয়ে শক্ত হয় এবং সুগন্ধ ও স্বাদ কমে যায়। রাম্বুতান Non climacteric ফল হওয়ায় Post harvest period এ ইথিলন উৎপাদন ও শোষণের হা খুব বেশি। তাই, এ ফল লিচুর মত দ্রুত আর্দ্রতা হারায় এবং নষ্ট হতে থাকে।
ফলন
রাম্বুতান এর ফলন ১০-১২ টন/হেক্টর।
বারি’র একটি মাতৃমাছ থেকে বিগত বছরে প্রার ৫০০০(পাঁচ হাজার) টি ফল সংগৃহীত হয়েছিল
লেখকঃ উপব্যবস্থাপক (উৎপাদন),এগ্রো সার্ভিস বিভাগ, বিএডিসি, ঢাকা