লোকসানের বৃত্তে গম চাষিরাঃ কমে গেছে গমের আবাদ

লোকসানের বৃত্তে গম চাষিরা

লোকসানের বৃত্তে গম চাষিরা

কৃষিবিদ জাহেদুল আলম রুবেল

লোকসানের বৃত্তে গম চাষিরাঃ
সারাদেশে যে পরিমাণ গম উৎপাদন হয় তার ৫ ভাগের একভাগ গম উৎপাদন হয় ঠাকুরগাঁওয়ে। বাজার মূল্য না থাকা এবং সরকারি খাদ্যগুদামে সরাসরি গম বিক্রি করতে না পেরে বার বার লোকসান গুনায় এ জেলার গমচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকার গম চাষীদের লোকসান ঠেকাতে প্রনোদনা দিয়ে সরকারি গুদামে গম বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করলেও প্রকৃত চাষীরা সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত ও গমের নায্যমূল্য না পেয়ে এই জেলার চাষিরা গম আবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

ঠাকুরগাঁও জেলার মাটি তুলনামুলক উচুঁ এবং হিমালয়ের পাদদেশের জেলা হওয়ায় ঠাকুরগাঁওয়ে বড় পরিসরে গমের আবাদ হয়ে থাকে। গম উৎপাদনের দিক দিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রথম স্থানে রয়েছে। সারাদেশে যে পরিমান গম উৎপাদন হয় তার ৫ ভাগের একভাগ গম উৎপাদন হয় এ জেলায়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে গমচাষীরা গমের নায্যমূল্য না পাওয়ায় এবং সরকারি খাদ্যগুদামে সরাসরি গম বিক্রি করতে না পারায় গমচাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ঝুকছেন ভুট্টাসহ অন্য ফসলে।

কৃষকদের মতামতঃ
সদর উপজেলা জগন্নাথপুর ইউনিয়ন এলাকার গম চাষি আব্দুল জলিল জানান, এ বছর মান সম্মত বীজ না পাওয়ায় এবং পোকার আক্রমন বেশি থাকায় গমের উৎপাদন অনেকাংশে কমে গেছে। দানা হয়েছে ছোট ছোট, আর পোকার আক্রমনে একাথিকবার কীটনাশক বিষ স্প্রে করায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু বাজারে গমের মূল্য নেই বললেই চলে। একবিঘা জমিতে গম চাষ করতে হালচাষ, জৈব সার, চালানী সার, উন্নতমানের গমবীজ ,রোপনের পর জমিতে সেচ প্রদান,গম কর্তন ও মাড়াই পর্যন্ত ব্যয় হয় ৭ হতে ৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সে তুলনায় উৎপাদিত ১২ মণ গমের দাম ৬শ টাকা হিসেবে ৭২০০ টাকা। বর্তমানে বাজারে প্রতিমণ গম বিক্রি হয় ৬শ থেকে ৭শত টাকা মন দরে। ফলে অনেক কৃষক গমের উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না । লাভের মধ্যে লাভ গম গাছের ডাটা যা গ্রাম্য লোকজন জ্বালানি হিসেবে ব্যব্হার করে থাকে। তাই এবার কম গম আবাদ করেছেন তিনি।

বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার কালমেঘ এলাকার কৃষক আনোয়ার হোসেন জানান, সাধারন কৃষকরা অনেক কষ্ট করে গম চাষ করে। কিন্তু বাজারে গম বিক্রয় করে নায্য মূল্য পায়না কোন গম চাষি। সরকার গম কাটার পর থেকে গম কেনে না, কেনেন অনেক দেরিতে। কারণ, এ সময় গম কেনা হলে বাজারে গমের দাম বেড়ে যাবে, লাভবান হবেন কৃষক। সরকার প্রতিবছর মে মাসের শেষের দিকে অথবা জুনে গম কেনা শুরু করে। কিন্তু কৃষকরা এপ্রিলের শুরুতে গম কাটাই ও মাড়াই করে, আর এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে বাজরে গম বিক্রয় করে দেন। সরকার যদি এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে খাদ্য গুদামে গম ক্রয় করতো তাহলে সাধারন কৃষকেরা কিছুটা হলেও বাজারে দাম পেত।

সদর উপজেলা সালান্দর চৌধুরীপাড়া এলাকার সফিউল ইসলাম সফিক জানান, গত বছর খাদ্য গুদামে কৃষকদের গম বিক্রির জন্য উদ্বুদ্ধ করতে কেজি প্রতি ২৮টাকা দর নির্ধারণ করেছিলো সরকার। কিন্তু উৎপাদিত গম খাদ্য গুদামে বিক্রিতে বঞ্চিত হয়েছেন তিন সহ এই এলাকার অনেক কৃষক। বিক্রির প্রত্যায়ন স্লিপ পেতে কৃষকেরা নিরুপায় হয়ে মেম্বার, চেয়ারম্যান ও সরকার সমর্থীত দলীয় নেতা কর্মীদের দ্বারস্থ হয়েও খাদ্য গুদামে গম বিক্রি করতে পারেনি। এতে সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি ২৮ টাকার পরিবর্তে বাজারে অনেক কমে মাত্র ১৭টাকা কেজি দরে গম বিক্রি করতে হয়েছিলো । ফলে লাভতো দুরের কথা ,উৎপাদন খরচও উঠেনি বলে অভিযোগ কৃষকদের। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে এই এলাকার অনেক কৃষক এবছর গমের পরিবর্তে ভুট্টা, মরিচ ও সবজি আবাদ করেছে।

সদর উপজেলা বড়বালিয়া এলাকার রাজেন্দ্র নাথ বর্মন বলেন, সরকারি ভাবে গম সংগ্রহে জেলা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর গম চাষিদের নামের তালিকা তৈরি করে জেলা খাদ্য বিভাগে প্রেরণ করে। সে অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গম ক্রয় করে সরকার। কিন্তু যে তালিকা প্রেরণ করা হয় সেখানে সাধারন চাষিদের নাম থাকেনা। আর যাদের নাম থাকে তারাও বাধ্য হয়ে রাজনৈতিক সিন্ডিকেট মহলের লোকদের কাছে অসহায় হয়ে তাদের কার্ড চার থেকে পাঁচশত টাকা দিয়ে বিক্রি করে দেয়। তিনি আরো বলেন, ঋণ করে জমিতে গম চাষ করেন এবং গম উঠার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা বিক্রি করে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হন।
পীরগঞ্জ উপজেলার লোহাগাড়া এলাকার জগদিশ চন্দ্র বর্মণ বলেন, সরকারি গুদামে সরাসরি গম বিক্রির সুযোগ তিনি কখনোই পাননি। খাদ্য গুদামে গম বিক্রয়ের জন্য জেলার সরকার দলীয় রাজনৈতিক ব্যাক্তি ও ব্যাবসায়িদের একটি সিন্ডিকেট চক্র রয়েছে। তারাই জেলা খাদ্য বিভাগের সহযোগীতায় সাধারন কৃষকদের প্রতিবছর বঞ্চিত করে আসছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকারী খাদ্যগুদামে গম সংগ্রহ কার্যক্রম যখন চালু করা হয় তখন কৃষকদের ঘরে গম থাকে না। তাছাড়াও প্রান্তিক চাষিদের নিকট কৃষি কার্ডের মাধ্যমে গুদামে গম সংগ্রহ গম করা হলেও কোন চাষী সেখানে গম বিক্রির সুযোগ পায়না। সরকারি দলের নেতাকর্মীরা কৃষকদের সেসব কার্ড হাতিয়ে নিয়ে তাদের নামে গুদামে গম ঢুকায় এবং লাভবান হন তারা। দরিদ্র কৃষকদের ৪/৫ শ টাকা ধরিয়ে দিয়ে তাদের সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। একই কথা বলেন সে এলাকার অনেক গম চাষি।

লোকসানের বৃত্তে গম চাষিরাঃ
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আফতাব হোসেন জানান, কৃষকরা গম উৎপাদন করে যদি মাড়াই করে বাড়িতে মজুদ করে রাখতে পারে তাহলে গম সংগ্রহ মওসুমে সরাসরি গুদামে বিক্রি করে ভাল লাভবান হতে পারবে। এ বছর প্রকৃত কৃষকরা যেন সরকারি গুদামে সরকার নির্ধারিত মূল্যে গম বিক্রয় করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখবে কৃষি বিভাগ। তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে গম আবাদের লক্ষমাত্রা যেন আরো বৃদ্ধি পায় সেজন্য কৃষকদের গম আবাদে উৎসাহিত করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে সারাদেশে গম উৎপাদন হয় ১৪ লাখ মেট্রিক টন আর শুধু ঠাকুরগাঁও জেলায় উৎপাদন হয় প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন। ২০১৭ সালে ঠাকুরগাঁও জেলায় ৬৮ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় এবং অর্জিত হয় ৬৭ হাজার ৮২০ হেক্টর। চলতি বছর ঠাকুরগাঁও জেলায় ৬৬ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও গমের আবাদ হয়েছে ৬১ হাজার হেক্টর জমিতে। সরকারিভাবে গম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ১১ হাজার ৭৪৬ মেট্রিক টন ধরা হলেও তা অর্জিত হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের ভুমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু কৃষকদের গম বিক্রির লাভের বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্তাভোগীদের হাতে। তাই কৃষকরা যাতে সরকারের এই সংগ্রহ অভিযানের সুফল পায় সেজন্য সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করে গম ক্রয়ের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।

লেখক: মফস্বল সম্পাদক, কালের কণ্ঠ, বসুন্ধরা, ঢাকা।