এমজেএফ-এর সেমিনারে নারী কমিশন গঠনে সমর্থন আইনমন্ত্রীর

নারী কমিশন গঠনে

ঢাকা, ১০ মার্চ ২০২৬: আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান মঙ্গলবার নারী কমিশন গঠনে সমর্থন জানিয়ে বলেন, নারীর অধিকার-সংশ্লিষ্ট আইনগুলো নাগরিক সমাজের গবেষণাভিত্তিক পরামর্শের আলোকে আরও কার্যকর করা যেতে পারে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। সেমিনারে বক্তারা বলেন, নারী, কন্যাশিশু এবং জেন্ডার বৈচিত্র্যময় মানুষের ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির পথে যে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা রয়ে গেছে, তা জরুরি ভিত্তিতে দূর করতে হবে। তিনি
আরও বলেন, ক্রমেই উগ্রবাদী শক্তির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন নারীরা। বিদ্যমান আইনকে পাশ কাটিয়ে নয়, বরং উত্তরাধিকার অধিকারের প্রশ্নে কার্যকর বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে।
এ বছর নারী দিবসের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ছিল “সকল নারী ও কন্যাশিশুর জন্য অধিকার, ন্যায়বিচার ও কার্যকর পদক্ষেপ”। “ব্রেক ব্যারিয়ার, বিল্ড জাস্টিস” বাণীতে ঢাকার বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে একটি জাতীয় সেমিনার আয়োজন করা হয়। এতে সরকার, দূতাবাস, উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক সংস্থা, নাগরিক সমাজ এবং নারী অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেতো রেংগলি এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. দাউদ মিয়া, এনডিসি। সম্মানিত অতিথি হিসেবে
ছিলেন ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলি সিং, জাতিসংঘের মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার আইরিন খান, এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন।
স্বাগত বক্তব্যে এমজেএফের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, দেশে নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও, নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের অভাব এখনো সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি। সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্ষণ মামলায় দণ্ডের হার ১ শতাংশেরও কম, আর নারীর প্রতি সহিংসতা-সংক্রান্ত প্রায় ১০ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
পাশাপাশি তিনি আইনমন্ত্রীকে আহ্বান জানান, আগামী বছরগুলোতে নারীরা যেন ন্যায়বিচারে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে পায়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। এমজেএফ জানায়, নারী ও মেয়েদের অধিকার সুরক্ষা, সহিংসতা প্রতিরোধ, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার জোরদার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারেরই অংশ এই আয়োজন। বিশেষত জেন্ডার, দারিদ্র্য, প্রতিবন্ধকতা, জাতিগত পরিচয় কিংবা সামাজিক বঞ্চনার কারণে যারা বহুমাত্রিক বৈষম্যের শিকার, তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এ প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু।
অনুষ্ঠানের সূচনায় বটতলা থিয়েটার গ্রুপ পরিবেশন করে বাচিক “হার সাইলেন্ট ট্রেইল”, যেখানে ন্যায়বিচারের অভাবে নারী ও শিশুর নীরবতা, ট্রমা এবং প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এমজেএফের কো-অর্ডিনেটর – প্রোগ্রাম, রুমা সুলতানা। তিনি বলেন, যখন বেঁচে থাকা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পেতে বারবার অপমান, বিলম্ব এবং বঞ্চনার মুখোমুখি হতে হয়, তখন আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে আর নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, পুলিশ অনেক সময় মামলা নিতে অনাগ্রহী থাকে, পারিবারিক সহিংসতাকে এখনো ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এছাড়াও সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বলতা বিচার প্রক্রিয়াকে আরো দীর্ঘায়িত করে। অনুষ্ঠানের প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন এমজেএফের ডিরেক্টর, রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রামস, বনশ্রী মিত্র নিয়োগী।
তিনি বলেন, স্বচ্ছতার ঘাটতি, দুর্বল জবাবদিহিতা এবং সামগ্রিক কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তার ভাষায়, নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু ধর্ষণ বা পারিবারিক নির্যাতনে সীমাবদ্ধ নয়; এসিড আক্রমণ থেকে শুরু করে প্রতিদিনের ভয়ের সংস্কৃতিও এর অংশ। এই কাঠামোগত বাধা মোকাবিলা না করলে অর্থবহ ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। আইনি সহায়তা ও নারী অধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বলেন, ন্যায়বিচারের পথে বাধা আদালতের ভেতরে শুরু হয় না, বরং আদালতে পৌঁছানোর অনেক আগেই শুরু হয় এবং অনেক সময় রায় হওয়ার পরও তা শেষ হয় না। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রেখা সাহা বলেন, অনেক
ক্ষেত্রে সাজা হওয়ার পরও ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর মামলা তুলে নিতে ভয়ভীতি, সামাজিক চাপ এবং হয়রানি চলতেই থাকে। ফলে অপরাধীর শাস্তি হলেও ন্যায়বিচার পূর্ণতা পায় না, যদি ভুক্তভোগীর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) অ্যাডভোকেট সেলিনা আখতার বলেন, ধর্ষণ মামলায় পুলিশ, হাসপাতাল, সাক্ষী এবং পরিবারের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন হলেও বাস্তবে ভুক্তভোগীকেই পুরো প্রক্রিয়ায় পুনরায় ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় শুরুতেই আলামত নষ্ট হয়ে যায়, সাক্ষী নিশ্চিত করা কঠিন হয়, আর জামিনে বেরিয়ে আসা আসামিরা ভুক্তভোগী পক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) নিঘাত সীমা বলেন, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন,২০১০ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন হলেও তা পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। কারণ, পারিবারিক সহিংসতা এখনো সমাজে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এ আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা খুবই কম। তিনি আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলেন, বিশেষ করে জেন্ডার বৈচিত্র্যময় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক ভুক্তভোগী মামলা করতে নিরুৎসাহিত হন, বিচারপ্রক্রিয়ায় পুনরায় ট্রমার শিকার হন, কিংবা দুর্বল আইনি সহায়তা ও অপ্রতুল প্রাতিষ্ঠানিক সাড়ার কারণে আরও জটিলতায় পড়ে যান। তিনি বলেন, শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবার জন্য আইনি সহায়তা ও সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।
অতিথিদের বক্তব্যেও ন্যায়বিচার-ব্যবস্থার গভীর সংস্কারের দাবি উঠে আসে। গীতাঞ্জলি সিং বলেন, ন্যায়বিচার ছাড়া অধিকার ফাঁপা হয়ে যায়; আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে অধিকার শক্তিতে পরিণত হয়। আইরিন খান বলেন, মানবাধিকার বিশ্বজুড়ে কঠিন সময় পার করছে, তাই আইনকে এমন হতে হবে, যা বৈষম্য ও অনিরাপত্তা বাড়াবে না, বরং সুরক্ষা দেবে। তিনি আরও বলেন, কেবল আইন সংস্কারই যথেষ্ট নয়, নারীর ন্যায়বিচারপ্রাপ্তিকে সমর্থন জানাতে সমাজকেও বদলাতে হবে। ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ন্যায়বিচারকে শুধু শাস্তি হিসেবে দেখলে হবে না; জবাবদিহি, পুনর্বাসন এবং সামাজিক রূপান্তরকেও এর অংশ হিসেবে বুঝতে হবে। মো. দাউদ মিয়া এনডিসি বলেন, প্রয়োজনীয় আইন থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফাঁকফোকর এখনো রয়ে গেছে, এবং অংশগ্রহণকারীদের সুপারিশ বাস্তবায়নে তিনি সহায়তা করবেন। রেতো রেংগলি বলেন, নারীর সমতা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অংশগ্রহণের যে অগ্রগতি হয়েছে, তার পেছনে নারী অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের নিরলস কাজ বড় ভূমিকা রেখেছে।
আলোচনার জবাবে আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার মানবাধিকার ও নারীর অধিকারের প্রশ্নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, নারীর নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার মতো উদ্যোগগুলো পরিবার ও সমাজে নারীর অবস্থান শক্তিশালী করার অংশ। নারী কমিশন গঠনের পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, নাগরিক সমাজের গবেষণা ও সুপারিশ বিদ্যমান আইনকে আরও কার্যকর করতে সহায়ক হতে পারে। একইসঙ্গে তিনি নাগরিক সমাজকে জবাবদিহিতার প্রশ্নে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানান।
সমাপনী বক্তব্যে শাহীন আনাম বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষাসহ সাম্প্রতিক নারী-বান্ধব অধ্যাদেশগুলোকে টেকসই আইনে রূপান্তর করতে হবে এবং বৈষম্যমূলক বিধানগুলো বিলম্ব না করে সংশোধন করতে হবে।
এমজেএফ জানায়, আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল প্রতীকী উদযাপনে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিদ্যমান আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, বৈষম্যমূলক বিধানের সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং সকল নারী ও কন্যাশিশুর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব। যাতে বাংলাদেশের প্রতিটি নারী ও কন্যাশিশুর মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সমতার সঙ্গে বাঁচতে পারে, সে লক্ষ্যে অধিকার,
ন্যায়বিচার এবং কার্যকর পদক্ষেপকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন থেকে সামগ্রিকভাবে আরো বলা হয়,আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল প্রতীকী উদযাপনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিদ্যমান আইন আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন,প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার জবাবদিহিতা এবং সব সম্প্রদায়ের নারী ও কিশোরীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, অধিকার, ন্যায়বিচার ও পদক্ষেপের দাবি বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে হবে, যাতে বাংলাদেশের প্রতিটি নারী ও কিশোরী মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কণ্ঠস্বর নিয়ে বাঁচতে পারে।

Advisory Editor

Advisory Editor of http://www.krishisongbad.com/

Learn More →